Story

৩৬ বছরের দাম্পত্য, পরকীয়ার সন্দেহ ও বিবাহবিচ্ছেদ: স্বামীর শেষকৃত্যে শ্বশুরের এক বিস্ফোরক সত্য পায়ের তলার মাটি কেড়ে নিল

আমি ট্রয়কে পাঁচ বছর বয়স থেকেই চিনতাম। আমাদের বাড়ি ছিল একেবারে পাশাপাশি, যেগুলোর সীমানায় থাকা কাঠের বেড়ার ফাঁক দিয়ে আমরা ছোটবেলায় একে অপরকে ডাকতাম। একই ধুলোমাখা রাস্তায় খেলে, স্কুলের একই ঘণ্টার শব্দ শুনে এবং একই স্বপ্নের জাল বুনে কেটেছিল আমাদের শৈশব। কুড়ি বছর বয়সে যখন আমরা বিয়ে করি, তখন উভয় পরিবারের কেউই অবাক হয়নি। সবাই বরাবরই জানত যে আমরা একে অপরের জন্যই তৈরি হয়েছিলাম। আমাদের বিবাহিত জীবনের প্রথম পঁয়ত্রিশটি বছর নদীর শান্ত স্রোতের মতো সহজ, সুন্দর ও স্থিতিশীল ছিল। আমাদের দুটি সন্তান হলো—একটি মেয়ে ও একটি ছেলে। দুজনেই নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরিবার তৈরি করে দূর শহরে বসবাস শুরু করল। আমরা দুজন আমাদের সেই পুরোনো, শান্ত বাড়িতে একে অপরের হাত ধরে বার্ধক্যের দোরগোড়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলাম। আমার মনে হতো, আমাদের মাঝে লুকিয়ে রাখার মতো কিছুই নেই।

কিন্তু দাম্পত্যের পঁয়ত্রিশতম বছরে এসে হঠাৎ সবকিছু তছনছ হতে শুরু করল। আমাদের যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে বিপুল অঙ্কের টাকা উধাও হতে লাগল। বিষয়টি আমি জানতে পারি যখন আমার জন্মদিনে ছেলে কিছু টাকা পাঠিয়েছিল এবং আমি তা সেভিংস অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করতে ব্যাংকের অনলাইন পোর্টালে ঢুকি। সেখানকার ব্যালেন্স দেখে আমার চোখ কপালে ওঠার উপক্রম হলো। অ্যাকাউন্ট থেকে হাজার হাজার ডলার তুলে নেওয়া হয়েছে। ঠিক এক সপ্তাহ পর আবারও একটি বড় অঙ্ক উধাও। মনে হচ্ছিল, যেন কেউ আমাদের সারা জীবনের সঞ্চয় গোপনে, কোনো চিহ্ন না রেখে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।

যখন আমি প্রথমবার ট্রয়কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি, তখন তার মুখের রঙ উড়ে গেল। চোখ নামিয়ে সে বলল, “কিছু পুরোনো বিল বাকি ছিল, সেটাই পরিশোধ করেছি।” কয়েক দিন পর যখন আবার টাকা উধাও হলো, তখন সে বলল, “বাড়ি মেরামতের কাজের জন্য কিছু অগ্রিম দিয়েছি।” এবং তৃতীয়বার সে বিরক্ত হয়ে বলল, “টাকাগুলো একটি নিরাপদ জায়গায় বিনিয়োগ করেছি, সব ফেরত চলে আসবে।” কিন্তু সেই টাকা আর কখনোই ফিরে আসেনি। যে ট্রয় একসময় ডায়েরিতে পাই-পয়সার হিসেব লিখে রাখত, সে-ই এখন কথায় কথায় খিটখিট করত এবং আমার চোখের দিকে তাকাতেও কুণ্ঠাবোধ করত।

সত্যের সবচেয়ে বড় আঘাতটি আমি পাই তার এক সপ্তাহ পরে। এক সন্ধ্যায় লিভিং রুমে টিভির রিমোটের ব্যাটারি খুঁজতে গিয়ে ট্রয়ের স্টাডি টেবিলের ড্রয়ারটি খুলি। সেখানে ফাইলের নিচে চাপা পড়া কিছু রসিদ আমার হাতে আসে। সেগুলো ছিল শহরের একটি অত্যন্ত দামি ও অভিজাত হোটেলের রসিদ। প্রতিটি রসিদেই একই হোটেলের নাম, একই শহর এবং আশ্চর্যের বিষয়—একই রুম নম্বর লেখা। তারিখগুলো ছিল ঠিক সেই দিনগুলোর, যখন ট্রয় পুরোনো বন্ধুদের সাথে দেখা করতে কিংবা কোনো জরুরি কাজের অজুহাতে শহরের বাইরে যেত।

সেই মুহূর্তে আমার পায়ের তলার মাটি সরে গেল। বুক এত দ্রুত ধড়ফড় করছিল যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। কাঁপতে থাকা হাতে আমি সেই হোটেলের নম্বরে ফোন করলাম। উদ্বেগ গোপন রেখে নিজেকে ট্রয়ের ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয় দিয়ে বললাম, আমার স্যার পরবর্তী সফরের জন্য আগের সেই রুমটিই বুক করতে চান।

হোটেলের রিসেপশনিস্ট কোনো দ্বিধা ছাড়াই হাসিমুখে উত্তর দিল, “আরে হ্যাঁ, মিস্টার ট্রয়! উনি তো আমাদের নিয়মিত অতিথি। সেই রুমটি তো প্রতি মাসেই প্রায় ওনার জন্যই নির্ধারিত থাকে। আপনি একদম চিন্তা করবেন না, ওনার রুম প্রস্তুত থাকবে।”

এই একটি বাক্য আমার বত্রিশ বছরের সাজানো পৃথিবীকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিল। সন্ধ্যায় ট্রয় বাড়ি ফিরতেই আমি সেই সমস্ত হোটেলের রসিদ ডাইনিং টেবিলে তার সামনে ছুঁড়ে মারলাম। কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে আমি সত্য জানতে চাইলাম। জানতে চাইলাম, কে সেই নারী যার জন্য সে আমাদের ঘর, সঞ্চয় এবং সম্পর্ককে বাজি রাখছে? কিন্তু ট্রয় রসিদগুলোর কথা অস্বীকারও করল না, আবার নিজের নির্দোষ হওয়ার পক্ষে একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল; তার চোখ ছিল আবেগহীন ও বরফের মতো ঠান্ডা। সে আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিল যেন সমস্ত দোষ, সমস্ত তিক্ততা শুধুই আমার।

সেই অপমান, অবিশ্বাস আর নীরব প্রতারণার বোঝা নিয়ে এক ছাদের নিচে থাকা আমার পক্ষে আর সম্ভব ছিল না। যাকে আমি সর্বস্ব ভেবেছিলাম, সে নিমেষেই আমাকে পর করে দিল। ছত্রিশ বছরের দীর্ঘ ও সুন্দর সম্পর্কের ইতি ঘটল আদালতের এক নির্জন কক্ষে বিবাহবিচ্ছেদের কাগজে সই করার মাধ্যমে। ট্রয় কোনো তর্ক ছাড়াই বাড়ির মালিকানা আমার নামে লিখে দিল, নিজের অল্প কিছু জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে চিরতরে চলে গেল।

বিবাহবিচ্ছেদের পরের দুটি বছর ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ ও যন্ত্রণাদায়ক। প্রতিদিন সেই শূন্য বাড়িতে বসে ভাবতাম—আমার কী ভুল ছিল? তারপর হঠাৎ একদিন ফোনের রিং বেজে উঠল। ওপাশ থেকে ছেলের কান্নায় ভেঙে পড়া কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ট্রয় আর এই পৃথিবীতে নেই। হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।

খবরটি শুনে আমার হৃদয় অসাড় হয়ে গেল। রাগ, ঘৃণা, ভালোবাসা, পুরোনো স্মৃতি—সবকিছু যেন একসাথে বুকে আছড়ে পড়ল। ছত্রিশ বছরের সঙ্গ এভাবে তো মুছে ফেলা যায় না। সমস্ত তিক্ততা ভুলে আমি তার শেষকৃত্যে যাওয়া আটকাতে পারলাম না।

শেষকৃত্যের দিনটি ছিল অত্যন্ত বিষণ্ণ ও হিমশীতল। আকাশ থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। কবরস্থানে মাত্র কয়েকজন মানুষ উপস্থিত ছিলেন। প্রার্থনা শেষ হয়ে লোকজন যখন একে একে চলে যেতে লাগল, তখনই ট্রয়ের ৮১ বছর বয়সী বাবা আর্থার টলমল পায়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তার শরীর থেকে হুইস্কির তীব্র গন্ধ বের হচ্ছিল। কান্নায় তার চোখ দুটি লাল হয়ে ফুলে উঠেছিল এবং মুখে ছিল এক অদ্ভুত অস্থিরতা ও যন্ত্রণা। তিনি আমার খুব কাছে এসে কাঁপতে থাকা আঙুল দিয়ে আমার কাঁধ ধরে ফ্যাসফেঁসে গলায় ফিসফিস করে বললেন:

“তুমি জানোই না সে তোমার জন্য কী করেছে, তাই না? তুমি ভেবেছিলে সে অবিশ্বস্ত ছিল? তোমার ধারণা সে তোমাকে প্রতারিত করেছে? যদি একবার জানতে পারতে আমার ছেলে আসলে কেমন মানুষ ছিল!”

তার কথা শুনে আমার গা শিউরে উঠল। আমি তার কাঁপতে থাকা হাত ধরে বললাম, “আর্থার, আপনি প্রকৃতিস্থ নেই। আপনি অতিরিক্ত মদ্যপান করেছেন।”

“হ্যাঁ, আমি পান করেছি!” তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন, “কারণ সুস্থ মাথায় আমি সেই যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছি না যা ট্রয় একা নিজের বুকের ভেতর চেপে রেখেছিল! সে আমার কাছ থেকে শপথ নিয়েছিল, যতদিন বেঁচে থাকবে আমি যেন তোমাকে কিছু না জানাই। সে নিজের জীবন বিসর্জন দিল, সম্মান হারাল, তোমাকে হারাল, তবুও সত্য প্রকাশ হতে দিল না! কিন্তু আজ সে চলে গেছে… এই পাপের বোঝা নিয়ে আমি আর বাঁচতে পারছি না!”

আর্থার তার পকেট থেকে একটি পুরোনো, বাঁকানো চাবি বের করে আমার হাতে গুঁজে দিলেন। “এটা ওর সেই হোটেলের ঘরের আলমারির চাবি, মৃত্যুর দিন পর্যন্ত যা ও ছাড়েনি। যাও, নিজে গিয়ে দেখে এসো আমার ছেলে সেখানে আসলে কী করছিল!”

কবরস্থান থেকে বেরিয়ে আমার পা দুটি যেন আপনাআপনি সেই হোটেলের দিকে এগোতে লাগল। সারা শরীর কাঁপছিল। হোটেলের তিন তলার সেই কক্ষের সামনে পৌঁছে কাঁপতে থাকা হাতে তালার ভেতর চাবি ঢোকাতেও পারছিলাম না। অবশেষে দরজা খুলল। ভেতরে কোনো বিলাসিতা, কোনো সুবাসিত আতর কিংবা কোনো নারীর উপস্থিতির ছিটেফোঁটাও ছিল না।

সেই ঘরটি কোনো আমোদ-প্রমোদের জায়গা ছিল না, বরং একটি জীবন্ত গবেষণাগার এবং হাসপাতালের মতো লাগছিল। ঘরের দেওয়ালজুড়ে সাঁটানো ছিল অসংখ্য মেডিকেল চার্ট, এক্স-রে প্লেট এবং প্রেসক্রিপশন। টেবিলের ওপর স্তূপ করে রাখা ছিল জটিল নিউরোলজির বই, মেডিকেল ফাইল এবং ওষুধের খালি প্যাকেট।

কাঁপতে কাঁপতে আমি টেবিলের ওপরে রাখা ফাইলটি তুলে নিলাম। তাতে ট্রয়ের নাম ছিল না। সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল আমার নাম—’লরা’।

ফাইলের পাতা ওল্টাতেই পায়ের তলার মাটি পুরোপুরি ধসে পড়ল এবং চোখ দিয়ে অঝোরে জল নামতে লাগল। আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে, যখন আমি মাথা ঘোরার সমস্যা নিয়ে সাধারণ চেকআপ করাতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম, ডাক্তাররা কিছু বিশেষ পরীক্ষা করেছিলেন। সেই রিপোর্ট সরাসরি ট্রয়ের হাতে পৌঁছেছিল। আমার এক অত্যন্ত দুর্লভ ও দুরারোগ্য স্নায়ুরোগ (Rare Neurological Disease) ধরা পড়েছিল—এমন এক ব্যাধি যাতে মানুষ ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি হারায়, শরীর ক্রমশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং অবশেষে রোগী সম্পূর্ণ পঙ্গু হয়ে যায়। ডাক্তাররা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, এর কোনো নিশ্চিত চিকিৎসা নেই এবং রোগীর আয়ু অত্যন্ত সীমিত।

ট্রয় এই কঠিন সত্যটি আমার কাছে সম্পূর্ণ গোপন রেখেছিল। সে চায়নি আমি আমার বাকি দিনগুলো এই ভয়াবহ আতঙ্কে আর হতাশায় কাটাই যে আমি সবকিছু ভুলে যাব বা পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ব। নিজের চোখের সামনে নিজের ধ্বংস দেখতে দিতে সে চায়নি।

ফাইলের নিচেই রাখা ছিল একটি ডায়েরি, যেখানে ট্রয়ের চিরচেনা হাতের লেখায় প্রতিদিনের হিসেব স্পষ্ট লেখা ছিল। ব্যাংকের সেই অর্থ কোনো পরনারীর পেছনে নয়, বরং সুইজারল্যান্ড ও আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় নিউরোলজিস্ট এবং রিসার্চ ল্যাবে পাঠানো হচ্ছিল। ট্রয় সারা বিশ্বের গবেষকদের সাথে যোগাযোগ করছিল, আমাদের জীবনের সমস্ত সঞ্চয় একটি পরীক্ষামূলক থেরাপি (Experimental Therapy) তৈরির পেছনে ঢেলে দিয়েছিল, যাতে আমার সেই মরণব্যাধি সারিয়ে তোলা যায়।

আর সেই হোটেলের ঘর? ট্রয় কোনো অনৈতিক কাজের জন্য সেখানে যেত না। সে সেখানে আন্তর্জাতিক গবেষক ও বিজ্ঞানীদের সাথে গোপনে ও অনলাইনে মিটিং করত। দিন-রাত এক করে সেই ঘরে বসে আমার রোগের চিকিৎসার খোঁজ করত, যাতে বাড়িতে থাকার সময় তার চোখের আতঙ্ক ও কান্না আমার চোখে না পড়ে। সে আমার সামনে সবসময় সেই প্রাণবন্ত, হাসিখুশি ট্রয় হয়েই থাকতে চেয়েছিল।

ডায়েরির শেষ পাতাটি লেখা হয়েছিল সেই রাতে, যেদিন আমি তাকে পরকীয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিলাম। অশ্রুভেজা অস্পষ্ট হরফে সেখানে লেখা ছিল:

“আজ লরা আমাকে সন্দেহ করল। সে ভাবল আমি অন্য কোনো নারীর সাথে জড়িয়ে পড়েছি। যখন সে রসিদগুলো আমার মুখে ছুঁড়ে মারল, আমার মন চাইছিল চিৎকার করে সব সত্যি বলে দিই। তাকে জড়িয়ে ধরে বলি—আমার ভালোবাসা, আমি তোমাকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করছি, তোমাকে হারানোর ভয়ে প্রতিটা সেকেন্ড তিলে তিলে মরছি।

কিন্তু আমি সত্যিটা বলে দিলে ও ভেঙে পড়বে। প্রতিদিন নিজের মৃত্যুর অপেক্ষা করবে। নিজের রোগের ভয়ে প্রতি মুহূর্তে ধুঁকে ধুঁকে বাঁচবে। আর এই ওষুধ আবিষ্কারে আমি যদি ব্যর্থ হই, ও তো জ্যান্তই মরে যাবে। তার চেয়ে ও আমাকে ঘৃণা করুক। ঘৃণা মানুষকে শক্ত করে, কিন্তু অসহায়ত্ব ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেয়। আমাকে চরিত্রহীন ভেবে, আমাকে ঘৃণা করে যদি ও ভালো থাকতে পারে, জীবনের বাকি কটা দিন ভয়হীন সম্মানের সাথে কাটাতে পারে, তবে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষ হতেও আমি রাজি। আমি ডিভোর্সের কাগজে সই করে দেব। ও আমাকে যত বেশি ঘৃণা করবে, আমি চলে যাওয়ার পর ওর কষ্ট ততটাই কম হবে। ঈশ্বর, শুধু ওষুধটা যেন সফল হয়… আমার লরাকে যেন সুস্থ দেখতে পারি।”

সেই লেখাগুলো পড়ার পর আমার বুকফাটা চিৎকার বেরিয়ে এলো। আমি সেই হিমশীতল মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ে বুকে হাত দিয়ে বুকভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়লাম। যাকে আমি প্রতারক ভেবেছিলাম, যাকে নিজের জীবন থেকে ঘেন্নাভরে বের করে দিয়েছিলাম, মৃত্যুর দিন পর্যন্ত যাকে ক্ষমা করতে পারিনি… সে আমার জন্য জীবনের সবচেয়ে বড় আত্মবলিদান দিয়ে গেল! নিজের আত্মসম্মান, নিজের মর্যাদা, স্ত্রীর ভালোবাসা—সবকিছু বিসর্জন দিয়ে দিল, শুধু যেন আমাকে কোনো মারণব্যাধির যন্ত্রণা ভোগ করতে না হয়।

ডায়েরির শেষ খামের ভেতর রাখা ছিল একটি মেডিকেল সার্টিফিকেট এবং ওষুধের একটি ছোট শিশি। মাত্র ছয় মাস আগেই সেই পরীক্ষামূলক ওষুধটি সফলভাবে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কী নির্মম পরিহাস—অহোরাত্র অমানুষিক মানসিক চাপ, নিঃসঙ্গতা আর নিজের শরীরের চরম অবহেলার কারণে ট্রয়ের হৃদযন্ত্র আগেই ক্লান্ত ও অকেজো হয়ে পড়েছিল। আমাকে বাঁচানোর যুদ্ধে সে নিজেই নিজের প্রাণ হারিয়ে ফেলল।

সেদিন সেই নির্জন হোটেলের ঘরে বসে আমি উপলব্ধি করলাম, ভালোবাসা মানে শুধু একসাথে থাকা, হাত ধরা বা মিষ্টি কথা বলা নয়। কখনো কখনো ভালোবাসা মানে নিজেকে নিঃশব্দে ধূলিসাৎ করে দেওয়া, যাতে প্রিয় মানুষটি কোনো ভয় ছাড়া শান্তিতে শ্বাস নিতে পারে। ট্রয় চলে গেছে, কিন্তু আমার বুকে এমন এক ঋণের পাহাড় রেখে গেছে, যা সাত জন্মেও শোধ করার সাধ্য আমার নেই।

-

You Might Also Enjoy