নিষ্পাপ শিশুর স্কুলব্যাগ থেকে বের হওয়া সেই ভয়ানক ছবি, যা দেখে শিউরে উঠেছিল মায়ের আত্মা: “এখনই পুলিশকে ফোন করো!”—আর ফাঁস হয়ে গেল চার দেওয়ালের মাঝে লুকিয়ে থাকা সবচেয়ে বিভৎস রহস্য
তখন বিকেল প্রায় সাড়ে পাঁচটা। বাইরের আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল আর জানালার কাচে এসে আছড়ে পড়ছিল হালকা বৃষ্টির ফোঁটা। মিরান্ডা প্রতিদিনের মতোই রান্নাঘরে তার সাত বছরের ছেলে লিওর জন্য স্যুপ ও স্যান্ডউইচ তৈরি করছিল। গোটা বাড়ি জুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে ছিল—সেই একই নিস্তব্ধতা, যা গত তিন সপ্তাহ ধরে এই বাড়ির প্রতিটি কোণে, প্রতিটি দেওয়ালে ধীরে ধীরে বাসা বাঁধছিল।
লিও সবসময়ই এক চঞ্চল, হাসিখুশি আর প্রশ্নপ্রবণ শিশু ছিল। স্কুল থেকে ফিরে এসেই সে কথার তোড়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে নিত। কোন শিক্ষক কেমন পড়ালেন, খেলার মাঠে সে নতুন কী দেখল, সহপাঠী কী দুষ্টুমি করল—মায়ের সাথে প্রতিটি ছোট-বড় কথা ভাগ করে না নেওয়া পর্যন্ত তার যেন শান্তি হতো না। কিন্তু গত কয়েকটা দিন ধরে লিও পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল। সে স্কুল থেকে ফিরে এসে করিডোরের কোণে নিঃশব্দে নিজের ভারী স্কুলব্যাগটা ফেলে রাখত, আর কারও চোখের দিকে না তাকিয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে যেত। জানালার পাশে মেঝেতে বসে নিজের হাঁটু দুটোকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেভাবেই কাটিয়ে দিত। মিরান্ডা যখন জিজ্ঞেস করত কী হয়েছে, সে শুধু চোখের পাতা নামিয়ে বলত, “কিছু না মা, আসলে একটু ক্লান্তি লাগছে।”
মিরান্ডা প্রথমে ভেবেছিল হয়তো প্রথম শ্রেণির নতুন সিলেবাসের চাপ তার ওপর বেশি পড়ছে, কিংবা স্কুলে কোনো সহপাঠী হয়তো তাকে কিছু বলেছে। সে স্কুলের শিক্ষিকা মিস হেলেনার সাথে ফোনে কথাও বলেছিল, কিন্তু তিনি জানিয়েছিলেন যে লিও ক্লাসে চুপচাপ বসে থাকে, পড়াশোনায় মন দেয়, কেবল কারও সাথে কথা বলে না আর টিফিনের সময় একাকী এক কোণে বসে থাকে। মিরান্ডার মনে এক অজানা আশঙ্কা ধীরে ধীরে ডালপালা মেলছিল। একজন মায়ের হৃদয় কখনো ভুল সংকেত দেয় না, আর মিরান্ডার অন্তরাত্মা বারবার জানান দিচ্ছিল যে এমন কিছু একটা ঘটছে যা তার চোখের আড়ালে রয়ে গেছে।

সেই সন্ধ্যায়, লিও যখন নিজের ঘরে আনমনা হয়ে বসেছিল, মিরান্ডা ভাবল একবার ওর স্কুলব্যাগটা পরীক্ষা করে দেখবে। হয়তো খাতার ভেতরে কোনো চিরকূট আছে, কিংবা কোনো অসম্পূর্ণ বাড়ির কাজ রয়ে গেছে যার ভয়ে বাচ্চাটা এত সিঁটিয়ে আছে। সে হলওয়েতে রাখা নীল স্কুলব্যাগটার চেইন আস্তে করে খুলল। ব্যাগ থেকে পেনসিল বক্স, খালি জলের বোতল আর আধখাওয়া রুটির টিফিন বাক্স বেরিয়ে এল। বইপত্র ওল্টাতে গিয়ে মিরান্ডার আঙুল গিয়ে ঠেকল ভাঁজ করা এক খসখসে সাদা ড্রয়িং শিটে। কাগজটা বেশ দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিল, যেন আতঙ্কের চোটে কেউ ওটাকে বারবার ভাঁজ করেছে আর আবার সোজা করেছে।
বিশেষ কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই মিরান্ডা কাগজটি খুলল। সে ভেবেছিল বরাবরের মতো গাছপালা, নীল আকাশ কিংবা কোনো কার্টুন চরিত্রের নিষ্পাপ স্কেচই হবে হয়তো।
কিন্তু কাগজটা পুরোপুরি খুলতেই মিরান্ডার হাত কেঁপে উঠল। পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল আর গলা চিরে বেরিয়ে এল এক অসহায় আর্তনাদ। ঘরের বাতাস যেন এক নিমেষে বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
সেই পাতায় লাল আর কালো ক্রেয়ন দিয়ে আঁকা হয়েছিল এক চরম বিভৎস ছবি। ছবিতে ছিল এক বিরাট, বিকৃত আর ভয়ানক দেখতে মুখ, যার চোখ দুটো কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসছিল আর কপালে আঁকা ছিল ক্রোধের গভীর রেখা। মুখ জুড়ে অদ্ভুত তীক্ষ্ণ দাড়ি আর খাড়া খাড়া চুল। কিন্তু যা দেখে বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল, তা হলো সেই বিশালাকার মুখের ঠিক নিচে আঁকা দ্বিতীয় ছবিটি—একটি ছোট্ট, কাঁদতে থাকা শিশু, যার বুক ও শরীর জুড়ে লাল রঙের গভীর গোল গোল দাগ। লাল রঙের দাগগুলো কাগজে এমনভাবে আঁকা হয়েছিল যেন তাজা ক্ষত থেকে ক্রমাগত রক্ত ঝরছে। ছোট্ট শিশুটির হাত দুটো বাঁধা অবস্থায় দেখানো হয়েছিল আর তার পায়ের নিচে ছিল কাঁটাতার বা খাঁচার মতো নকশা। সেই দানবীয় মুখের এক বিরাট হাত এগিয়ে যাচ্ছিল শিশুটির গলার দিকে।
কাগজের ওপরের কোণে পেনসিল দিয়ে কাঁপাকাঁপা অক্ষরে একটি নাম লেখা ছিল। সেই নামটি দেখামাত্রই মিরান্ডার হাত থেকে কাগজটি মেঝেতে খসে পড়ল। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করল।
নামটি ছিল: “আঙ্কেল ডেভিড”।
ডেভিড কোনো অচেনা মানুষ ছিল না। সে মিরান্ডার স্বামী আর্থারের অত্যন্ত কাছের তুতো ভাই। প্রায় এক মাস আগে একটি জরুরি কাজের সূত্রে আর্থারকে যখন অন্য শহরে যেতে হয়েছিল, তখন ডেভিড নিজেই যেচে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। ডেভিডকে সবাই এক শান্ত, ভদ্র ও সম্মানিত মানুষ হিসেবেই চিনত। সে প্রায়ই বিকেলে লিওকে পার্কে নিয়ে যাওয়া কিংবা স্কুল থেকে নিয়ে আসার কাজে মিরান্ডাকে সাহায্য করত, যাতে মিরান্ডা নিশ্চিন্তে তার ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর কাজ শেষ করতে পারে। মিরান্ডা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি যে নিজের পরিবারের সদস্য ভেবে যাকে তারা অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছিল, সেই মুখের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এমন এক নরপিশাচ।
মিরান্ডা টলমল পায়ে দৌড়ে গেল লিওর ঘরের দিকে। দরজাটা আধখোলা ছিল। লিও ঘরের অন্ধকার কোণে, হিটারের পাশে মেঝেতে গুটিসুটি মেরে বসে ছিল, মাথাটা গুঁজে রেখেছিল হাঁটুর ভেতর। সে নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।
মিরান্ডা মেঝেতে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে সে লিওর মুখটি ওপরে তুলল। বাচ্চার নিষ্পাপ চোখ দুটো কান্নায় ফুলে উঠেছিল আর তার সারা শরীর শুকনো পাতার মতো কাঁপছিল।
“লিও… বাবা আমার, মায়ের দিকে তাকাও,” অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলল মিরান্ডা। সে ভাঁজ করা কাগজটি লিওর চোখের সামনে রাখল। “এটা… এটা কী বাবা? আমাকে সত্যি বলো, কাউকে ভয় পাওয়ার কোনো দরকার নেই। তোমার মা তোমার কাছেই আছে।”

ছবিটা দেখামাত্রই লিওর চোখ আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল। সে এক ঝটকায় নিজের হাত দুটো পেছনে টেনে নিয়ে কেঁদে চেঁচিয়ে উঠল, “না মা! ওটা লুকিয়ে রাখো! আঙ্কেল ডেভিড জানতে পারলে আমাকে সেই অন্ধকার বেসমেন্টে বন্দি করে রাখবে! তিনি বলেছেন আমি যদি তোমাকে কিছু বলি, তবে তিনি তোমার অনেক বড় ক্ষতি করবেন!”
লিওর এই কথাগুলো জ্বলন্ত ছুরির মতো মিরান্ডার বুকে গিয়ে বিঁধল। তার ছোট্ট সন্তান এতগুলো সপ্তাহ ধরে এই অসহ্য যন্ত্রণা আর ভয় একা একাই সহ্য করে গেছে, কেবল নিজের মাকে নিরাপদে রাখার জন্য। এক মায়ের মাতৃত্ব ভেতর থেকে গর্জে উঠল। সে লিওকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
“লিও, আমাকে দেখাও… ও তোমার সাথে কী করেছে?” রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল মিরান্ডা।
কাঁপতে থাকা হাতে সেই সাত বছরের নিষ্পাপ শিশুটি তার নীল টি-শার্টটা আস্তে আস্তে ওপরের দিকে তুলল।
মিরান্ডার চোখ যখন তার বুক আর পাঁজরের ওপর পড়ল, সে আর্তনাদ করে উঠে নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। লিওর নরম শরীরে সিগারেটের আগুনে পোড়ানো গভীর কালো আর লাল গোল গোল দাগ—ঠিক যেমনটা সে ড্রয়িং শিটে লাল ক্রেয়ন দিয়ে এঁকেছিল। তার পিঠে আর কাঁধে ছিল আঙুল দিয়ে চেপে ধরার নীলচে কালশিটে দাগ।
মিরান্ডার মাথায় সব কিছু এক নিমেষে পরিষ্কার হয়ে গেল। দুই সপ্তাহ আগে যখন সে লিওর গায়ে একটা ছোট লাল দাগ দেখেছিল, তখন ডেভিড খুব স্বাভাবিকভাবে হেসে বলেছিল যে পার্কে খেলার সময় লিও সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে শুকনো ডালের খোঁচা খেয়েছিল। মিরান্ডা তখন তা বিশ্বাস করে নিয়েছিল। সেই অন্ধ বিশ্বাসের অনুশোচনা এখন বিষের মতো তার রক্তে বয়ে যেতে লাগল।
“আপনি যখন রান্নাঘরে খাবার তৈরি করতেন বা ফোনে কথা বলতেন,” লিও হিক্কা তুলতে তুলতে থেমে থেমে বলতে শুরু করল, “আঙ্কেল ডেভিড আমাকে বেসমেন্টে নিয়ে যেতেন। তিনি নিজের সিগারেট বের করে বলতেন এটা আমাদের সিক্রেট গেম। আমি যদি চেঁচাতাম বা কাঁদতাম, তবে তিনি আমাকে সেখানেই বন্দি করে রাখার ভয় দেখাতেন। তিনি বলেছিলেন তাঁর কাছে একটা বড় ছুরি আছে, আমি একটাও কথা বললে তিনি তোমাকেও শেষ করে দেবেন…”
বাচ্চার প্রতিটি কথার সাথে সাথে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। মিরান্ডা বুঝতে পারল যে এখন দুর্বল হওয়া বা কাঁদার সময় নয়। সে যদি ভেঙে পড়ে, তবে তার সন্তান আর কোনোদিনই নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারবে না। তার চোখের জলের জায়গা দখল করল এক প্রচণ্ড, নিয়ন্ত্রণহীন আক্রোশ।
এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সে ফোন তুলে জরুরি নম্বরে ডায়াল করল।
ফোনের রিং হলো এবং ওপাশ থেকে এক গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল, “ইমারজেন্সি হেল্পলাইন, কীভাবে সাহায্য করতে পারি?”
“এখনই পুলিশ পাঠান! এক্ষুনি!” মিরান্ডা চিৎকার করে উঠল, তার কণ্ঠে ছিল আহত বাঘিনীর গর্জন। “আমার বাড়িতে অবিলম্বে পুলিশ আর মেডিকেল টিম পাঠান! আমার বাচ্চার প্রাণ বিপন্ন… আমাদের মাঝেই এক পিশাচ লুকিয়ে আছে!”
সে পুলিশকে নিজের ঠিকানা দিয়ে পরিস্থিতির ভয়াবহতা জানাল। পুলিশের অপারেটর তাকে শান্ত থাকতে এবং ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে বাচ্চার সাথে থাকতে পরামর্শ দিলেন।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই, নিচের সদর দরজার তালা খোলার শব্দ হলো।
‘ক্লিক।’
মিরান্ডার হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। বাড়ির চাবি মাত্র তিনজনের কাছে ছিল—তার নিজের কাছে, তার স্বামীর কাছে (যিনি শহরের বাইরে), আর ডেভিডের কাছে।
ডেভিড ফিরে এসেছে।
নিচে ভারী জুতোর আওয়াজ শোনা গেল। ডেভিড প্রতিদিনের মতোই শিষ দিতে দিতে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। “মিরান্ডা? লিও? তোমরা কোথায়? দ্যাখো আমি বাজার থেকে আইসক্রিম এনেছি!” তার গলার স্বরে ছিল সেই চেনা কৃত্রিম মিষ্টি সুর, যা এখন মিরান্ডার কানে এক বিষাক্ত সাপের হিসহিস শব্দের মতো ঠেকল।
লিও আতঙ্কে মিরান্ডার হাত এমন শক্ত করে খামচে ধরল যে তার নখ মিরান্ডার ত্বকে বসে গেল। বাচ্চাটি ভয়ে কাঁপছিল, তার শ্বাস আটকে আসছিল। “মা… ও এসে গেছে… ও আমাকে মেরে ফেলবে…”
“তোমাকে কেউ ছোঁবে না লিও। তোমার মা বেঁচে থাকতে কারও সেই সাহস নেই,” ফিসফিস করে বলল মিরান্ডা। সে লিওকে আলমারির পেছনে আড়াল করে দাঁড় করিয়ে নিঃশব্দে শোবার ঘরের দরজা ভেতর থেকে লক করে দিল।
তখনই সিঁড়িতে ভারী পায়ের আওয়াজ কাছে এগিয়ে আসতে লাগল। ডেভিড ওপরে উঠে আসছে।
“লিও? তুমি কি ঘরে আছো চ্যাম্পিয়ন?” ডেভিডের কণ্ঠ এখন দরজার ঠিক বাইরে। সে দরজার হাতল ঘোরাল, কিন্তু দরজা বন্ধ ছিল।
দরজা না খোলায় বাইরে এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল। তারপর দরজায় পড়ল এক ভারী আঘাত।
“মিরান্ডা? দরজা বন্ধ কেন? সব ঠিক আছে তো?” ডেভিডের গলার সেই কৃত্রিম মিষ্টতা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে সন্দেহের রুক্ষতা ফুটে বেরোল।
মিরান্ডা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ঘরের কোণে রাখা একটি ভারী পিতলের ল্যাম্পের দিকে তার চোখ পড়ল। কোনো শব্দ না করে সে দুই হাতে ল্যাম্পটি তুলে নিল। তার সমস্ত ইন্দ্রিয় এখন কেবল সন্তানের সুরক্ষায় নিবেদিত।
“ডেভিড, তুমি এখান থেকে এখনই চলে যাও,” দরজার ওপার থেকে মিরান্ডা অত্যন্ত শান্ত কিন্তু ইস্পাতকঠিন গলায় বলল। “আমি সব জেনে গেছি। লিও আমাকে সব দেখিয়ে দিয়েছে… সেই আঁকা ছবি, ওর শরীরের ক্ষত… সব কিছু।”
দরজার ওপাশে হঠাৎ এক নিদারুণ নীরবতা নেমে এল। একটু আগের সেই শিসের আওয়াজ সম্পূর্ণ থেমে গেছে।
কয়েক সেকেন্ড পর ডেভিডের গলা শোনা গেল। কিন্তু সেটা আর কোনো পারিবারিক আত্মীয়ের কণ্ঠ ছিল না; তা রূপ নিয়েছিল এক বরফশীতল, নিষ্ঠুর ও ভয়ংকর ফিসফিসানিতে। “মিরান্ডা… তুমি ওই বাচ্চার আজেবাজে ড্রয়িং বিশ্বাস করলে? ওটা তো স্রেফ একটা খেলা ছিল। দরজা খোলো, আমরা সামনাসামনি বসে কথা বলি। তুমি তিলকে তাল করছ।”
“আমি পুলিশ ডেকেছি ডেভিড! তারা যেকোনো মুহূর্তে এখানে পৌঁছে যাবে!” চিৎকার করে বলল মিরান্ডা।
কথাটা শোনামাত্রই ডেভিডের ধৈর্যের বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে গেল। সে সর্বশক্তি দিয়ে দরজায় লাথি মারল।
‘ধড়াম!’
কাঠের সাধারণ দরজাটা ফ্রেম সমেত কেঁপে উঠল। আলমারির পেছনে ভয়ে চিৎকার করে উঠল লিও।
“দরজা খোলো মিরান্ডা! কাউকে একটা কথাও যদি বলেছ, তোমাদের দুজনের একজনও বাঁচবে না!” উন্মত্তের মতো দরজা ভাঙার চেষ্টা করতে লাগল ডেভিড। দরজার কাঠে ফাটল ধরতে শুরু করল। সে বারবার নিজের ভারী শরীর দিয়ে দরজায় আছড়ে পড়তে লাগল।
মিরান্ডা বুঝতে পারল দরজাটা আর বেশিক্ষণ টিকবে না। সে পিতলের ল্যাম্পটা দুই হাতে শক্ত করে ধরে দরজার ঠিক মুখোমুখি অবস্থান নিল। তার মনের সমস্ত ভয় উবে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছিল এক মায়ের অটল সংকল্প। সেই পিশাচকে লিওর কাছে পৌঁছাতে হলে আগে মিরান্ডার লাশের ওপর দিয়ে যেতে হবে।
‘মড়মড়!’
দরজার লক ভেঙে গিয়ে এক ঝটকায় কপাট খুলে গেল। ক্ষুধার্ত জানোয়ারের মতো ভেতরে ঢুকল ডেভিড। তার চোখ দুটো ছিল রক্তবর্ণ আর মুখে ছিল এক নারকীয় হাসি। তার হাতে উদ্যত ছিল ভারী টুলবক্সের একটি রেঞ্চ।
যেমনই সে লিওর দিকে এক পা বাড়াল, মিরান্ডা কালবিলম্ব না করে সর্বশক্তি দিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। হাতের সেই ভারী পিতলের ল্যাম্পটি সে সজোরে ডেভিডের মুখে বসিয়ে দিল।
এক তীব্র ধাতব শব্দের সাথে ল্যাম্পটি ডেভিডের কপাল ও কাঁধে গিয়ে আছড়ে পড়ল। ব্যথায় ককিয়ে উঠে টাল সামলাতে না পেরে ডেভিড পেছনে ছিটকে পড়ল। তার কপাল বেয়ে রক্তের সরু ধারা নেমে এল। কিন্তু সে ছিল ভারী চেহারার লোক; মুহূর্তের মধ্যে সামলে নিয়ে সে মিরান্ডার কবজি চেপে ধরে তাকে সজোরে দেওয়ালের দিকে ঠেলে দিল।
মিরান্ডার পিঠ সশব্দে দেওয়ালে ধাক্কা খেল এবং হাত থেকে ল্যাম্পটি মেঝেতে ছিটকে গেল। ডেভিড তার আঙুলগুলো মিরান্ডার গলার দিকে বাড়িয়ে দিল। “তোমার চুপ থাকা উচিত ছিল মিরান্ডা… তোমার ওই কাগজটা কখনোই দেখা উচিত হয়নি!”
ঠিক সেই মুহূর্তে, বাড়ির বাইরে সাইরেনের তীব্র শব্দ গর্জে উঠল। লাল আর নীল বাতির ঝলকানি জানালার কাচ ভেদ করে শোবার ঘরের দেওয়ালে নাচতে শুরু করল।
টায়ারের তীব্র ঘর্ষণের আওয়াজ এল, আর নিচের হলওয়েতে গমগম করে উঠল বহু বুটের শব্দ।
“পুলিশ! অস্ত্র ফেলে হাত ওপরে তোলো!” নিচ থেকে ভারী গলার হুংকার ভেসে এল।
সাইরেনের শব্দ কানে যেতেই ডেভিডের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চোখের সেই হিংস্রতা এক লহমায় আতঙ্কে রূপান্তরিত হলো। সে মিরান্ডাকে ছেড়ে দিয়ে পেছনের বাগান দিয়ে পালানোর উদ্দেশ্যে জানালার দিকে দৌড় দিল।
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
চারজন সশস্ত্র পুলিশ অফিসার সিঁড়ি ভেঙে সোজা ঘরে ঢুকে পড়লেন। ডেভিড জানালার পাল্লা খোলার আগেই দুজন অফিসার তাকে চেপে ধরে মেঝেতে আছড়ে ফেললেন। চোখের পলকে তার দুই কবজিতে হাতকড়া পরিয়ে দেওয়া হলো।
ডেভিড মেঝেতে পড়ে ছটফট করতে লাগল, কিন্তু আইনের বাঁধন এতটাই শক্ত ছিল যে সে এক ইঞ্চিও নড়তে পারল না। অফিসাররা তাকে হিড়হিড় করে টেনে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামিয়ে নিয়ে গেলেন। তার সেই বিষাক্ত, বীভৎস উপস্থিতি চিরদিনের মতো সেই বাড়ি থেকে মুছে গেল।
ঘরে তখন রয়ে গিয়েছিলেন কেবল কয়েকজন সহৃদয় পুলিশ কর্মকর্তা এবং মেডিকেল টিমের সদস্যরা।
মিরান্ডা মেঝেতে বসে পড়ল। সে আলমারির পেছন থেকে লিওকে বের করে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল। মা-ছেলে দুজনেই কান্নায় ভেঙে পড়ল, কিন্তু এই কান্না আর ভয়ের ছিল না—এ ছিল সেই অন্ধকার থেকে মুক্তি পাওয়ার কান্না।
প্যারামেডিকরা লিওর ক্ষতের প্রাথমিক চিকিৎসা করলেন এবং তাকে আশ্বস্ত করলেন যে সে এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ। মহিলা পুলিশ অফিসারটি মেঝেতে পড়ে থাকা সেই দুমড়ানো ড্রয়িং শিটটি প্রমাণের জন্য ব্যাগে তুলে নিলেন। তিনি মিরান্ডার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “আজ যদি আপনি এই ছবিটিকে গুরুত্ব না দিতেন আর সাহস না দেখাতেন, তবে এই নিষ্পাপ শিশুটির সাথে কী ঘটে যেত তা ভাবতেও শিউরে উঠতে হয়। আপনার সতর্কতাই আজ একটি প্রাণ বাঁচিয়ে দিল।”
কয়েক ঘণ্টা পর, মিরান্ডার স্বামী আর্থারও বিধ্বস্ত অবস্থায় হাসপাতালে ছুটে এলেন। নিজের ভাইয়ের এই কদর্য রূপ আর লিওর ওপর ঘটে যাওয়া অকথ্য অত্যাচারের কথা শুনে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন। যাকে তিনি নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করেছিলেন, সে-ই তার সাজানো সংসারকে ধ্বংস করতে বসেছিল—এই সত্য মেনে নেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠছিল।
পরবর্তী পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে এল এক হাড়হিম করা তথ্য—ডেভিড কোনো সাধারণ অপরাধী ছিল না; সে ছিল বিকৃত মানসিকতার এক ধারাবাহিক অপরাধী, যে আগেও অন্য শহরে এমন ঘটনার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে ছিল, কিন্তু নিজের সামাজিক প্রভাব আর চাতুরীর জোরে পার পেয়ে যেত। লিওর হাতে আঁকা সেই একটি ছবিই তার বিরুদ্ধে আদালতে সবচেয়ে অকাট্য আইনি প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল। আদালত কালবিলম্ব না করে ডেভিডকে কঠোর কারাদণ্ডে দণ্ডিত করল, যাতে সে আর কোনোদিন কোনো শিশুর সোনালী শৈশবকে নিজের অন্ধকারের ছায়ায় স্পর্শ না করতে পারে।
সেই ভয়াল রাতের কয়েক মাস পর, মিরান্ডা আর আর্থার সেই পুরোনো বাড়ি চিরতরে ছেড়ে শহরের এক শান্ত, খোলামেলা এলাকায় নতুন এক নীড় বাঁধল। নতুন বাড়ির বড় বড় জানালা দিয়ে সারাদিন খেলা করত উজ্জ্বল রোদ।
কাউন্সেলিং এবং বাবা-মায়ের অপার ভালোবাসায় লিও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছিল। তার মুখে আবার ফিরে এসেছিল সেই হারানো মিষ্টি হাসি। সে এখন আবার কাগজে ছবি আঁকত, কিন্তু সেই ছবিতে আর কোনো দানবের মুখ বা লাল রঙের ক্ষতের দাগ থাকত না। এখন তার আঁকা পাতাজুড়ে থাকত বিশাল সবুজ গাছ, মিষ্টি রোদ, আকাশছোঁয়া পাহাড়, আর তার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট এক নিরাপদ ঘর—যার সদর দরজায় দাঁড়িয়ে হাসিমুখে অপেক্ষা করছে এক মা, যে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজের সন্তানের শৈশবকে এক নরকযন্ত্রণা থেকে বাঁচিয়ে এনেছিল।