Story

৩ বছরের নিষ্পাপ শিশুর মুখে অর্ধশতাব্দী পুরোনো সত্য: “আমাকে কুড়াল দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল!” আর ধ্বংসাবশেষের মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল সেই হাড়হিম করা রহস্য, যা কাঁপিয়ে দিল গোটা শহরকে

গোলান হাইটসের শান্ত উপত্যকায় গড়ে ওঠা সেই ছোট্ট জনপদটি পরিচিত ছিল তার সবুজ ঢাল, জলপাই বাগান আর শতাব্দীপ্রাচীন পাথুরে দেওয়ালের জন্য। এখানকার মানুষজন বহু প্রজন্ম ধরে এক শান্ত ও সাদামাটা জীবন কাটিয়ে আসছিলেন, যেখানে প্রত্যেকেই একে অপরের পরিবার ও অতীত ইতিহাস সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এই শান্ত জনপদেই বাস করতেন এলিয়াস ও তাঁর স্ত্রী মরিয়ম, তাঁদের তিন বছর বয়সী পুত্রসন্তান কবিরকে নিয়ে। কবির দেখতে ছিল আর দশটা সাধারণ নিষ্পাপ শিশুর মতোই—ডাগর ডাগর বাদামি চোখ, কোঁকড়ানো চুল আর মুখে সর্বদা এক অমায়িক মিষ্টি হাসি। তবে জন্মের পর থেকেই তার মাথার পেছনের অংশে, ঠিক ঘাড়ের ওপরের সংযোগস্থলের কাছে, একটি লাল রঙের দীর্ঘ ও গভীর জন্মদাগ (Birthmark) ছিল। চিকিৎসকেরা এটিকে কেবল ত্বকের একটি সাধারণ দাগ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু মরিয়ম যখনই সেই দাগের ওপর আঙুল বোলাতেন, তাঁর শরীর জুড়ে এক অজানা শিহরণ বয়ে যেত।

কবিরের বয়স যখন দুই বছর হলো এবং সে ভাঙা ভাঙা শব্দে কথা বলতে শুরু করল, তখন থেকেই বাড়ির পরিবেশ ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে। সে প্রায়ই খেলতে খেলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে দরজার দিকে একপলকে তাকিয়ে থাকত। কখনো কখনো সে নিজের খেলনা ফেলে রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জানালার ধারে বসে থাকত এবং দূরের পাহাড় পেরিয়ে দৃশ্যমান পুরোনো ধ্বংসাবশেষের দিকে আঙুল নির্দেশ করত। শুরুতে এলিয়াস ও মরিয়ম ভেবেছিলেন এটা হয়তো একটি ছোট্ট শিশুর কল্পনার ডানা মেলা। বাচ্চারা প্রায়শই গল্প বানায় কিংবা চোখের সামনে যা দেখে তাকেই নিজের জগৎ বানিয়ে নেয়। কিন্তু কবির তিন বছরে পা দিতেই তার কথাবার্তা শৈশবের সারল্যের সীমানা পেরিয়ে এক অদ্ভুত ও ভীতিপ্রদ রূপ নিতে শুরু করল।

একদিন দুপুরের সময়, মরিয়ম যখন রান্নাঘরে জলপাইয়ের তেল গরম করছিলেন, কবির নিঃশব্দে এসে তাঁর পাশে দাঁড়াল। সে মায়ের আঁচল টেনে অত্যন্ত গম্ভীর ও শান্ত কণ্ঠে বলল, “মা, এই বাড়িতে আমার খুব অচেনা লাগে। আমার আসল বাড়ি ছিল ওই পাহাড়ের ওপারে। আমার একটা বড় সাদা বলদ ছিল আর আমার দুটো ছেলে ছিল, যারা আমার চেয়েও অনেক লম্বা ছিল।”

মরিয়ম চমকে উঠলেন। তিনি হেসে কথাটি উড়িয়ে দিতে চাইলেন, “বাবা, তুমি তো এখনো অনেক ছোট। তোমার কোনো ছেলে নেই, তুমি তো নিজেই আমাদের একমাত্র সন্তান।”

কিন্তু কবিরের মুখে হাসির কোনো চিহ্নমাত্র ছিল না। তার চোখ দুটো কোনো বৃদ্ধ মানুষের মতো ক্লান্ত ও বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল। সে নিজের মাথার পেছনের লাল দাগটির ওপর হাত রাখল এবং ফিসফিস করে বলল, “আমি মিথ্যা বলছি না মা। আমার এখানে খুব ব্যথা করে। সূর্য যখন ডুবছিল, তখন সে পেছন থেকে এসে ভারী কুড়াল দিয়ে আমাকে আঘাত করেছিল। চারিদিক লাল হয়ে গিয়েছিল… তারপর অন্ধকার নেমে এল। সে আমাকে পাথরের নিচে চাপা দিয়ে রেখেছিল।”

মরিয়মের হাত থেকে চামচটা খসে মেঝেতে পড়ে গেল। একটি তিন বছরের শিশু, যে কখনো মৃত্যু, কুড়াল কিংবা সহিংসতার নাম পর্যন্ত শোনেনি, সে এত স্পষ্ট ও বিশদভাবে এমন কথা কীভাবে বলতে পারে? সেই রাতে এলিয়াস বাড়ি ফিরলে মরিয়ম কাঁদতে কাঁদতে তাকে সবকিছু খুলে বললেন। এলিয়াস ছিলেন বাস্তববাদী ও আধুনিক চিন্তার মানুষ। তিনি বিষয়টিকে নিছক একটি দুঃস্বপ্ন কিংবা টেলিভিশনে দেখা কোনো কিছুর প্রভাব মনে করে উড়িয়ে দিলেন। তিনি কবিরকে বুকে জড়িয়ে নিলেন, তার কপালে চুমু খেয়ে বললেন যে সবকিছু ঠিক আছে।

কিন্তু পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে এই ঘটনা থামল না, বরং আরও গভীর রূপ নিল। রাতের বেলা কবির হঠাৎ আর্তনাদ করে ঘুম থেকে জেগে উঠত। সে ঘামে ভিজে একাকার হয়ে নিজের ঘাড় চেপে ধরে কাঁদত। সে বারবার একটিই নাম আওড়াত—”সমীর… সমীর এমনটা করেছিল। জমির সীমানা নিয়ে আমাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। সে পেছন থেকে আমাকে আঘাত করেছিল।”

বিষয়টি আর কেবল ঘরের চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ রইল না। একদিন এলিয়াস যখন কবিরকে সঙ্গে নিয়ে বাজারে গেলেন, তখন কবির হঠাৎ একটি নির্দিষ্ট দিকে আঙুল তুলে জেদ ধরল যে তাকে সেই পুরোনো ঐতিহাসিক স্থানের দিকে নিয়ে যেতে হবে, যাকে স্থানীয়রা ‘পুরোনো ধ্বংসাবশেষ’ বলত। সেই জায়গাটি জনপদ থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে এক নির্জন পাথুরে পাহাড়ের ওপর অবস্থিত ছিল, যেখানে কয়েক দশক আগে একটি পুরোনো বসতি ছিল যা পরবর্তীকালে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। কবির মাটিতে বসে পড়ে কাঁদতে লাগল, “আমাকে ওখানে নিয়ে চলো! তোমরা যদি আমার কথা না শোনো, তবে আমার আত্মা কোনোদিন শান্তি পাবে না। আমার হাড়গোড় ওই পাথরের নিচেই চাপা পড়ে রয়েছে!”

বাজারে উপস্থিত অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ সেই শিশুর কথা শুনলেন। সেই অঞ্চলের প্রাচীন দ্রুজ (Druze) সংস্কৃতিতে পুনর্জন্ম ও পূর্বজন্মের স্মৃতির বহু কাহিনী প্রজন্ম ধরে প্রচলিত ছিল, যাকে তারা নিজেদের ভাষায় ‘নৎক’ (Nutq) বলে অভিহিত করতেন—যার অর্থ পূর্বজন্মের স্মৃতি জাগ্রত হওয়া। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রবীণ চিকিৎসক, ডক্টর হায়দার—যিনি কয়েক দশক ধরে সেখানে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছিলেন এবং স্থানীয় ইতিহাসের গভীর সমঝদার ছিলেন—তিনি এগিয়ে এলেন। তিনি কবিরের চোখের দিকে তাকালেন এবং তারপর এলিয়াসকে বললেন, “এলিয়াস, এই শিশুর কথাগুলোকে কেবল মনের ভুল ভেবে চেপে রেখো না। ওর কথার মধ্যে এক অদ্ভুত বেদনা আর সত্যের প্রতিধ্বনি রয়েছে। ও যেখানে নিয়ে যেতে চাইছে, আমাদের একবার সেখানে গিয়ে দেখা উচিত। যদি এটি মিথ্যা হয়, তবে ওর মনের বিভ্রান্তি কেটে যাবে; আর যদি এতে কোনো সত্যতা থাকে, তবে এই শিশুর মানসিক বোঝা চিরতরে দূর হয়ে যাবে।”

এলিয়াস ভারাক্রান্ত মনে রাজি হলেন। পরদিন সকালে ডক্টর হায়দার, জনপদের দুজন গণ্যমান্য প্রবীণ ব্যক্তি, এলিয়াস, মরিয়ম এবং কয়েকজন স্থানীয় মানুষ কবিরকে সাথে নিয়ে সেই পাথুরে পাহাড়ের দিকে রওনা হলেন। কবির এলিয়াসের আঙুল ধরে সবার আগে আগে হেঁটে যাচ্ছিল। তারা যত সেই ঐতিহাসিক স্থান ও পুরোনো পাথরের ঢিবির কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছিল, কবিরের চলার গতিতে কোনো দ্বিধা দেখা যাচ্ছিল না। সে এমনভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল যেন সেই পথের প্রতিটি পাথর, প্রতিটি বাঁক এবং প্রতিটি কাঁটাঝোপের সাথে তার বহু শতাব্দীর পরিচয় রয়েছে।

পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে কবির একটি পুরোনো, অর্ধেক ভেঙে পড়া পাথরের বাড়ির সামনে এসে থামল। সে বাড়ির ভাঙা চৌকাঠের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “এটা আমার বাড়ি ছিল। এই উঠোনে একটা ডুমুর গাছ থাকত।”

ডক্টর হায়দার ও বয়োজ্যেষ্ঠরা একে অপরের মুখের দিকে তাকালেন। প্রবীণদের একজন মৃদু স্বরে বললেন, “পঞ্চাশ বছর আগে এখানে সত্যিই একটি বড় ডুমুর গাছ ছিল, যা বজ্রপাতের পর কেটে ফেলা হয়েছিল। এই বাচ্চার পক্ষে এই কথা জানা কীভাবে সম্ভব?”

কবির সেখানেই থেমে রইল না। সে বাড়ির পেছনের দিকে গেল, যেখানে একটি পুরোনো কাঠের বেড়া ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাথরের স্তূপ ছিল। এটি সেই জায়গা যেখানে ঐতিহাসিক পাথরের ধ্বংসাবশেষ চাপা পড়ে ছিল। কবির সেই বেড়ার কাছে গিয়ে দাঁড়াল, নিজের ছোট্ট জুতো দিয়ে নিচের মাটিতে ঠোক্কর মারল এবং সম্পূর্ণ শান্ত ও অবিচল কণ্ঠে বলল, “এখানে। ও আমাকে এখানে পুঁতে রেখেছিল। আমার ওপর বড় বড় কালো পাথর চাপা দিয়ে রেখেছিল যাতে কোনো কুকুর বা শিয়াল আমাকে খুঁজে না পায়।”

সেখানে উপস্থিত প্রত্যেকের গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। চারপাশ জুড়ে এক নিস্তব্ধতা নেমে এল, যেখানে কেবল বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। এলিয়াসের কপালে জমে উঠল শীতল ঘামের ফোঁটা। তিনি ডক্টর হায়দারের দিকে তাকালেন। চিকিৎসক জনপদের যুবকদের কোদাল ও শাবল নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন।

মাটি খোঁড়ার কাজ শুরু হলো। কবির তার মায়ের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে সেই মাটির দিকে চেয়ে রইল। প্রায় তিন ফুট গভীর খোঁড়ার পর শাবলের ধাতব ফলক শক্ত কোনো কিছুর গায়ে লেগে এক ঝনঝন শব্দ তুলল।

কর্মীরা থেমে গেলেন। তাঁরা হাত দিয়ে সাবধানে শুকনো মাটি সরাতে লাগলেন। মাটির নিচ থেকে প্রথমে কয়েকটি বড় কালো পাথর বেরিয়ে এল, আর সেই পাথরগুলোর ঠিক নিচেই দৃশ্যমান হলো একটি মানব কঙ্কালের অবশিষ্টাংশ।

ভিড়ের মধ্য থেকে কারও রুদ্ধশ্বাস আর্তনাদ বেরিয়ে এল। মরিয়ম আতঙ্কে কবিরের চোখ নিজের বুকে লুকিয়ে ফেললেন, কিন্তু কবির নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অত্যন্ত নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে সেই গর্তের দিকে তাকাল।

কঙ্কালটিকে যখন সতর্কতার সাথে সম্পূর্ণ বাইরে আনা হলো, ফরেনসিক দৃষ্টিসম্পন্ন ডক্টর হায়দার সেই মাথার খুলিটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। খুলির পেছনের অংশে—ঠিক যে জায়গায় তিন বছরের কবিরের মাথায় গাঢ় লাল জন্মদাগটি ছিল—সেখানে একটি বড় ও গভীর ফাটল দৃশ্যমান ছিল। হাড়ের ভেতরের সেই নিখুঁত ক্ষতটি পরিষ্কার প্রমাণ করছিল যে কোনো ভারী ও ধারালো অস্ত্র, যেমন কুড়াল দিয়ে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করা হয়েছিল।

ঘটনার খবর তৎক্ষণাৎ স্থানীয় পুলিশ ও ফরেনসিক টিমকে দেওয়া হলো। পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে গোটা এলাকা ঘিরে ফেললেন। পুরোনো থানার কয়েক দশক আগের হলুদ হয়ে যাওয়া নথিপত্র ঘেঁটে দেখা হলো। সেই পুরোনো নথিপত্র থেকে এক চমকপ্রদ সত্য উদঘাটিত হলো—ঠিক ৪৮ বছর আগে, ১৯৭৮ সালে, সেই পাহাড়ি জনপদ থেকে ইউসুফ নামের এক ৪৫ বছর বয়সী কৃষক হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। সেই সময় পুলিশ একটি নিখোঁজ ডায়েরি নথিভুক্ত করেছিল, কিন্তু কোনো সূত্র বা মরদেহের সন্ধান না মেলায় বছরের পর বছর পর মামলাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইউসুফের পরিবারে তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে ছিল, যাঁরা পরবর্তীকালে সেই নির্জন জনপদ ছেড়ে দূরের কোনো বড় শহরে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন।

তবে এই কাহিনীর সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর মোড় তখনো বাকি ছিল।

পুলিশ কর্মকর্তারা যখন সেই কঙ্কালের পাশে দাঁড়িয়ে কবিরকে নানা প্রশ্ন করছিলেন, তখন কবির ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক অতি বৃদ্ধ, কাঁপতে থাকা ৮০ বছর বয়সী ব্যক্তির দিকে নিজের ছোট্ট আঙুলটি তুলল। সেই ব্যক্তি আর কেউ নন, সেই পুরোনো জনপদেরই বাসিন্দা সমীর, যিনি সেদিন কেবল কৌতূহলী দর্শক হয়ে ভিড়ের সাথে সেখানে এসেছিলেন।

কবিরের চোখ দুটো হঠাৎ ক্রোধ ও যন্ত্রণায় জ্বলে উঠল। সে নিজের তীক্ষ্ণ কণ্ঠে সেই বৃদ্ধের দিকে নির্দেশ করে বলল, “সমীর! তুই আমাকে সেদিন সন্ধ্যায় জলের কুয়োর কাছে ডেকেছিলি। তুই আমার জমি দখল করতে চেয়েছিলি। আমি যখন দলিলে আঙুলের ছাপ দিতে অস্বীকার করলাম, তুই পেছন থেকে কুড়াল দিয়ে আঘাত করলি। তারপর তুই সেই কুড়ালটিকে ওই পুরোনো শুকনো কুয়োর নিচে লোহার বাক্সে লুকিয়ে রেখেছিলি!”

এ কথা শোনামাত্রই ৮০ বছরের বৃদ্ধ সমীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। তার মুখমণ্ডল সম্পূর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে গেল এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। অর্ধশতাব্দী আগে ঘটে যাওয়া সেই জঘন্য অপরাধের কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বেঁচে ছিল না, কেবল সেই মানুষটি ছাড়া যাকে সে নিজের হাতে শেষ করে পাথরের নিচে চাপা দিয়ে রেখেছিল। আজ সেই একই মানুষ এক তিন বছরের নিষ্পাপ শিশুর রূপ ধারণ করে তার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে সেই মাটির নিচে চাপা পড়া সত্যকে গোটা দুনিয়ার সামনে উন্মোচিত করছিল।

সমীরের মানসিক প্রতিরোধ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ল। সে হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাতে মাথা চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। “আমাকে মাফ করে দাও… আমাকে মাফ করে দাও ইউসুফ! আমি প্রতি রাতে তোমার পায়ের আওয়াজ পেতাম। আমি জমির লোভে সেই মহাপাপ করেছিলাম। আমাকে এই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি দাও!”

সমীরের এই অপ্রত্যাশিত স্বীকারোক্তি পুলিশ ও সেখানে উপস্থিত শত শত মানুষকে স্তম্ভিত করে দিল। পুলিশ কালবিলম্ব না করে সেই শুকনো কুয়োয় তল্লাশি চালাল, এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো, আবর্জনার নিচ থেকে মরচে ধরা একটি পুরোনো কুড়াল উদ্ধার করা হলো, যা সেই স্বীকারোক্তি এবং কবিরের বলা প্রতিটি বিবরণের সাথে অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল।

আইন নিজের পথে এগোল এবং কয়েক দশক পুরোনো এক অমীমাংসিত রহস্যের পরিসমাপ্তি ঘটল। বয়সের ভার এবং নিজের অপরাধ স্বীকারের ভিত্তিতে সমীরকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হলো।

সেই ঐতিহাসিক স্থানে পাওয়া ইউসুফের দেহাবশেষ ধর্মীয় প্রথা ও পূর্ণ মর্যাদার সাথে সমাহিত করা হলো। সেদিন কবির তার বাবা ও মায়ের সাথে সেই শেষ বিদায়ে উপস্থিত ছিল। প্রার্থনা যখন শেষ হলো এবং কবরের ওপর এসে পড়ল সোনালি রোদের আভা, কবির তখন এক দীর্ঘ ও গভীর নিঃশ্বাস নিল।

তার চোখ থেকে সেই পুরোনো যন্ত্রণা, সেই নিদারুণ ভার এবং বৃদ্ধের মতো বিষণ্ণতা চিরদিনের জন্য মুছে গেল। সে তার মায়ের হাত ধরে মিষ্টি হেসে বলল, “মা, আমার খুব খিদে পেয়েছে। চলো বাড়ি যাই, খেলনা দিয়ে খেলব।”

সেই দিনের পর থেকে কবির আর কোনোদিন কোনো অতীত জীবন, কোনো কুড়াল বা পুরোনো বাড়ির কথা উল্লেখ করেনি। সে সম্পূর্ণ এক স্বাভাবিক, চঞ্চল ও প্রাণোচ্ছল শিশুতে পরিণত হলো। কিন্তু সেই জনপদের ইতিহাসে এবং সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে এই ঘটনা চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে রইল—মানুষ নিজের অপরাধকে মাটির যত গভীরেই লুকিয়ে রাখুক না কেন, প্রকৃতি ও সত্যের এমন নিজস্ব গোপন পথ রয়েছে যা সময়ের সমস্ত আবরণ ভেদ করে একদিন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেই ছাড়ে।

-

You Might Also Enjoy