Story

প্রতি রাতে মায়ের বরফশীতল কবরে মাথা রেখে ঘুমাত এক অসহায় ছেলে: গ্রামবাসী ভাবত পাগল, কিন্তু এক কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে কবরের পাথরে ফাটল ধরতেই বেরিয়ে এল হাড়হিম করা সত্য!

পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা পুরোনো ছোট্ট জনপদ ‘ব্ল্যাকউড’-এ যখনই সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসত আর পাইনের ঘন বন ফুঁড়ে বরফশীতল হাওয়া শিস দিয়ে বয়ে যেত, তখন কবরস্থানের সেই নিস্তব্ধতা আরও গা ছমছমে হয়ে উঠত। শতাব্দীপ্রাচীন সেই সমাধিস্থলের পাথুরে সমাধিগুলোতে শ্যাওলা জমে ছিল আর মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকত ঝরে পড়া সোনালি শুকনো পাতা। এমন এক গা ছমছমে পরিবেশে যেখানে সূর্যাস্তের পর কোনো পাখিও ডানা মেলার সাহস পেত না, ঠিক তখনই প্রতিদিন এক ছায়ামূর্তিকে সেই নির্জনতার দিকে হেঁটে যেতে দেখা যেত। সে ছিল চব্বিশ বছর বয়সী ড্যানিয়েল। গায়ে লাল হুডি জ্যাকেট, পরনে পুরোনো ছেঁড়া জিন্স আর চোখের কোণে অসহ্য শূন্যতা নিয়ে ড্যানিয়েল প্রতিদিন সন্ধ্যায় নিয়ম করে কবরস্থানের সবচেয়ে পুরোনো কোণে পৌঁছাত, যেখানে ছিল তার মা সারাহর ভারী, চারকোনা পাথরের সমাধি। সে সেই শ্যাওলাধরা ঠান্ডা পাথরের ওপর শুয়ে পড়ত, দুই পা বুকের কাছে গুটিয়ে নিত, হুডি দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলত এবং সারা রাত সেই পাথুরে বুকে নিজের মায়ের উষ্ণ কোল খুঁজে বেড়াত।

জনপদের মানুষ তাকে বহু আগেই পাগল বলে সাব্যস্ত করেছিল। বাজারের মোড়ে, কফি হাউসে কিংবা গির্জার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রায়ই ফিসফিস করে বলত, “বেচারা ড্যানিয়েল, মায়ের বিয়োগের আঘাত সহ্য করতে পারেনি। ওর মাথাটা পুরোপুরি বিগড়ে গেছে। কোনো সুস্থ মানুষ কি প্রতি রাতে ওই নির্জন শ্মশানে মৃতদের মাঝে গিয়ে শুয়ে থাকতে পারে?” কেউ কেউ তার প্রতি সহানুভূতি দেখাত, আবার অনেকেই তাকে অপয়া মনে করে দূরে এড়িয়ে চলত। তবে এই সমস্ত কটূক্তি আর অবহেলার কোনো তোয়াক্কা ছিল না ড্যানিয়েলের। তার কাছে সেই ঠান্ডা, কঠিন পাথরের ওপর নিজের বুক চেপে রাখাই ছিল এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর একমাত্র শান্তির আশ্রয়; কারণ সেই পাথরের নিচেই চিরঘুমে শায়িত ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি সারা জীবন নিঃস্বার্থভাবে কেবল ড্যানিয়েলের মুখের হাসির জন্যই উৎসর্গ করে গিয়েছিলেন।

মা সারাহ কোনো সাধারণ নারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, ধীরস্থির ও গভীর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এক নারী, যিনি একাই লড়াই করে বড় করেছিলেন ড্যানিয়েলকে। ড্যানিয়েলের বাবার ছায়া মুছে গিয়েছিল বহু আগেই, আর আত্মীয় বলতে তাদের ছিল কেবল সারাহর এক সৎ ভাই ভিক্টর ও তার চতুর স্ত্রী মার্গারেট। ভিক্টর ছিল শহরের এক লোভী ও ক্ষমতাবান ঠিকাদার, যার শকুনচোখ সর্বদা আটকে থাকত সারাহর সেই পুরোনো পৈতৃক বাড়ি আর মূল্যবান পাহাড়ি জমির ওপর। সারাহ যখন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন, তখন ভিক্টর ও মার্গারেট গোটা জনপদে কান্নাকাটির এমন নাটক সাজিয়েছিল যেন তারা শোকে পাথর হয়ে গেছে। কিন্তু শেষকৃত্যের ঠিক তৃতীয় দিনেই ভিক্টর নিজের আইনজীবীদের ডেকে সেই পৈতৃক বাড়ির মালিকানার কাগজপত্র তৈরির তোড়জোড় শুরু করে দেয়।

সেই দিনই ড্যানিয়েলকে গলাধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। ভিক্টর একটি জাল উইল প্রদর্শন করে দাবি করেছিল যে সারাহ নিজের সমস্ত সম্পত্তি ভাইয়ের নামে লিখে দিয়ে গেছেন, কারণ তার ছেলে মানসিকভাবে সুস্থ নয়। গৃহহীন, সর্বস্বান্ত ও নিঃসঙ্গ ড্যানিয়েলের মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই অবশিষ্ট ছিল না। তবে অর্থ-সম্পদ হারিয়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র আফসোস ড্যানিয়েলের ছিল না; তার বুক ফেটে যাচ্ছিল এই ভেবে যে সে তার জন্মদাত্রী মাকে হারিয়েছে। হাসপাতালে যে রাতে সারাহ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, সেই শান্ত কক্ষে তিনি কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে ড্যানিয়েলের আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরেছিলেন। তাঁর গলার স্বর ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ, এক হালকা ফিসফিসানির মতো—”ড্যানিয়েল, আমার বাছা… ওই সমাধিটাকে কখনো একা ফেলে যেও না। যতক্ষণ না ঝরে পড়া পাতাগুলো পুরোপুরি লাল হয়ে যায় আর মাটিতে প্রথম বরফের চাদর বিছিয়ে পড়ে, ততক্ষণ প্রতি রাতে ওখানেই থেকো। ওই পাথরটা কেবল আমার কবর নয়, ওটা তোমার সুরক্ষার ঢাল। মাঝরাতে যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়বে, তখন ওই পাথরের হৃৎস্পন্দন মন দিয়ে শুনো…”

সেই মুহূর্তে ড্যানিয়েল বুঝতে পারেনি মায়ের এই শেষ কথাগুলোর আসল অর্থ কী। সে ভেবেছিল ব্যথার ঘোরে হয়তো মা অসংলগ্ন কথা বলছেন। কিন্তু এক অনুগত সন্তানের মতো সে মায়ের প্রতিটি শব্দকে নিজের হৃদয়ে পাথরের অক্ষরের মতো খোদাই করে রেখেছিল। এই কারণেই আকাশে তুমুল বৃষ্টি নামুক, ঝড়ে গাছপালা ভেঙে পড়ুক কিংবা হাড়কাঁপানো ঠান্ডা নামুক—ড্যানিয়েল প্রতি সন্ধ্যায় সেই কবরস্থানে ফিরে যেতই।

মাঝে মাঝে রাত দুটো-তিনটের সময়, যখন চারপাশ জুড়ে কবরের নিস্তব্ধতা বিরাজ করত, ড্যানিয়েল নিজের কান পেতে রাখত সেই ভেজা, শ্যাওলাধরা পাথরের ওপর। শুরুর দিকে সে কেবল বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ শুনতে পেত, কিন্তু সপ্তাহ গড়ালে তার মনে হতে লাগল যেন সেই ভারী পাথরের নিচে কোনো অতি সূক্ষ্ম, যান্ত্রিক স্পন্দন চলছে—’টিক… টিক… টিক।’ সে বহুবার চোখ রগড়ে ভাবত হয়তো প্রচণ্ড শীত আর অনিদ্রার কারণে তার ক্লান্ত মস্তিষ্ক বিভ্রান্তি তৈরি করছে।

কিন্তু এক রাতে পরিস্থিতি এক ভয়াবহ রূপ নিল।

সেটি ছিল নভেম্বরের এক হাড়হিম করা কুয়াশাচ্ছন্ন রাত। গাছের সমস্ত শুকনো পাতা লাল আর বাদামি হয়ে মাটিতে ঝরে পড়েছিল। আকাশে ছিল ঘন মেঘের পাহারা, আর চাঁদের আলো কেবল একটি সরু রেখার মতো সেই পাতার ওপর চিকচিক করছিল। ড্যানিয়েল বরাবরের মতোই লাল হুডি মাথায় টেনে, হাঁটু ভাঁজ করে সেই চারকোনা কবরের ওপর শুয়ে ছিল। রাত তখন আনুমানিক আড়াইটা। চারপাশ এতটাই নিস্তব্ধ ছিল যে ড্যানিয়েল নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল।

ঠিক তখনই, দূরের বনের মেঠোপথ থেকে শুকনো পাতা মাড়ানোর আওয়াজ ভেসে এল—’মচ… মচ… মচ।’

ড্যানিয়েল তৎক্ষণাৎ সজাগ হয়ে উঠল। সে চোখ আধবোজা করে হুডির আড়াল থেকে নিঃশব্দে তাকাল। অন্ধকারে টর্চ আর লোহার ভারী শাবল হাতে দুটি অবয়ব কবরস্থানের জং ধরা গেট ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করছিল। টর্চের হলুদ আলো যখন তাদের মুখে পড়ল, ড্যানিয়েলের রক্ত টগবগ করে উঠল। এরা আর কেউ নয়, তার লোভী মামা ভিক্টর এবং তার এক দুর্ধর্ষ সাগরেদ কার্ল।

“তাড়াতাড়ি হাত চালাও কার্ল, আমাদের হাতে বেশি সময় নেই,” ভিক্টরের চাপা, ভীত কণ্ঠ অন্ধকারে শোনা গেল। “পাগল ছেলেটা হয়তো আজ এত ঠান্ডায় আসেনি। আজ রাতেই আমাদের এই পাথর সরাতে হবে।”

“কিন্তু মালিক, কেউ যদি দেখে ফেলে?” কার্ল ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, তার হাতের ভারী লোহার শাবলটি কাঁপছিল। “কবর খোঁড়া মারাত্মক অপরাধ। পুলিশ জানতে পারলে সোজা শ্রীঘরে চালান করে দেবে।”

“বোকার মতো কথা বোলো না!” ভিক্টর ফিসফিস করে ধমক দিল। “আমার বোন সারাহ অত্যন্ত ধূর্ত ছিল। সে তার আসল উইল আর পারিবারিক বহুমূল্য হীরেগুলো ওই বাড়ির কোথাও রাখেনি। আমি ওর পুরো শোবার ঘর, আলমারি, এমনকি মেঝের তক্তা পর্যন্ত উপড়ে ফেলেছি, কিন্তু কিছুই পাইনি। গতকাল ওর পুরোনো উকিলের একটি ডায়েরি থেকে জানতে পারলাম যে মৃত্যুর আগে এই সমাধি তৈরির জন্য সে এক দক্ষ কারিগরকে বিপুল অর্থ দিয়েছিল। নিশ্চিতভাবেই সে সমস্ত কিছু এই পাথুরে সিন্দুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে! আর সেই উইল যদি কারও হাতে পড়ে, তবে আমার গড়ে তোলা এই পুরো সাম্রাজ্য এক লহমায় ধুলোয় মিশে যাবে। তাই চুপচাপ এই পাথরটা তোলো!”

কবরের ওপর শুয়ে থাকা ড্যানিয়েলের গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। মায়ের সেই শেষ কথাগুলো বিদ্যুতের মতো তার মাথায় খেলে গেল—”ড্যানিয়েল, পাথরটাকে কখনো একা ছেড়ো না… ওরা ওটা ধ্বংস করতে আসবে…” সারাহ ভালো করেই জানতেন তাঁর ভাই কতটা নিচে নামতে পারে। তিনি জানতেন ভিক্টরের লোভ কবরের পবিত্রতাকেও ধুলোয় মিশিয়ে দিতে দ্বিধা করবে না। আর তিনি এটাও জানতেন যে একমাত্র তাঁর ছেলেটাই সেই সত্যের সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ভিক্টর ও কার্ল কবরের কাছাকাছি এসে টর্চের আলো সোজা সেই পাথরের ওপর ফেলল। আলো পড়তেই দুজনের চোখ কপালে উঠল। কবরের ওপর কোনো প্রেতাত্মা নয়, বরং লাল হুডি পরা ড্যানিয়েল পাথরের মূর্তির মতো স্থির বসে আছে। তার চোখ দুটো অন্ধকারে জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো জ্বলছিল।

কার্লের হাত থেকে শাবলটি ঝনঝন করে শুকনো পাতার ওপর খসে পড়ল। “ভূত! মালিক, এ তো সেই ছেলেটা!”

ভিক্টর এক মুহূর্তের জন্য চমকে পিছিয়ে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই সেই ভীতি হিংস্র ক্রোধে রূপ নিল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ওহ, তো তুই এখানে! রাস্তার কুকুরের মতো এখনো নিজের মরা মায়ের বুক আঁকড়ে পড়ে আছিস? সোজা মুখে এখান থেকে দূর হ ড্যানিয়েল, নইলে আজ তোর হাড়গোড়ও এই মাটিতে পুঁতে ফেলব!”

ড্যানিয়েল ধীরপায়ে সেই পাথরের ওপর সোজা হয়ে দাঁড়াল। দীর্ঘ কয়েকমাসের শীত, লাঞ্ছনা আর একাকীত্ব তার ভেতরের সমস্ত ভয়কে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। সে আর কোনো দুর্বল, অসহায় অনাথ বালক ছিল না; সে ছিল তার মায়ের শেষ নিদর্শনের এক অপরাজেয় প্রহরী।

“আমার মায়ের সমাধিতে যদি নোংরা হাত ছোঁয়ানোর চেষ্টা করো ভিক্টর,” ড্যানিয়েলের কণ্ঠ এতটাই গম্ভীর ও দৃঢ় শোনাল যে সামনে দাঁড়ানো দুজন লোক কেঁপে উঠল, “তবে এই পাথর ছোঁয়ার আগে তোমাদের নিজেদের কবর খুঁড়তে হবে।”

ভিক্টর রাগে উন্মত্ত হয়ে কার্লের দিকে তাকাল, “কী দেখছিস বোকার মতো? ও একা আর আমরা দুজন। ওকে পাথর থেকে টেনে নিচে আছড়ে ফেল!”

কার্ল সাহস সঞ্চয় করে শাবল উঁচিয়ে ড্যানিয়েলের দিকে তেড়ে গেল। সে আঘাত করার আগেই ড্যানিয়েল চোখের পলকে নিজেকে বাঁচিয়ে সমাধি থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ে সর্বশক্তি দিয়ে কার্লের পেটে লাথি চালাল। কার্ল ব্যথায় ককিয়ে উঠে কাদামাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ল। ভিক্টর পেছন থেকে ভারী পাথর তুলে ড্যানিয়েলের মাথায় আঘাত করতে উদ্যত হলো, কিন্তু ধস্তাধস্তির মাঝে ভিক্টরের পা পিছলে গেল এবং সে হাতের ভারী লোহার শাবলসহ সজোরে কবরের পাথরের কোণে গিয়ে আছড়ে পড়ল।

‘ধড়াম!’

ধাক্কাটা এতটাই তীব্র ছিল যে সেই প্রাচীন পাথরের উপরিভাগে এক গভীর ফাটল ধরে গেল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনা।

সেই ফাটলটি পাথরের ঠিক মাঝখানে খোদাই করা একটি গোলাপ ফুলের নকশায় গিয়ে ঠেকামাত্রই পাথরের ভেতর থেকে কোনো ভারী গিয়ার ঘোরার শব্দ শোনা গেল—’ক্লিক-ক্লিক-ক্লিক-ঝুউম।’

সেটি কোনো সাধারণ কবরের পাথর ছিল না; সেটি ছিল প্রাচীন সুইস সিন্দুকের আদলে তৈরি এক স্বয়ংক্রিয় গোপন ভল্ট। শতাব্দীর প্রাচীন নকশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই যান্ত্রিক তালাটি প্রবল আঘাত ও অভ্যন্তরীণ কৌশলের কারণে সচল হয়ে আনলক হয়ে গিয়েছিল। সেই বিশালাকার পাথরটি আপনাআপনি একপাশে সরে যেতে লাগল।

পাথর সরে যেতেই কবরের ওপরের অংশে তৈরি একটি গোপন কুঠুরি (Hidden Compartment) দৃশ্যমান হলো। সেখানে কোনো কঙ্কাল বা ধুলোবালি ছিল না; বরং ভেতরে কালো মখমলের কাপড়ে মোড়ানো একটি ভারী স্টিলের বাক্স রাখা ছিল, আর তার ওপর সাঁটা ছিল একটি স্বচ্ছ খাম, যার ওপর সারাহর সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা ছিল:

“আমার প্রিয় ছেলে ড্যানিয়েলের জন্য — সেই দিনের উদ্দেশ্যে, যখন অন্যায় তার সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে যাবে।”

এই দৃশ্য দেখে ভিক্টরের চোখ লোভে চকচক করে উঠল। সে মাটি থেকে উঠে সেই বাক্সের দিকে হাত বাড়াতে গেল, “ওটা আমার! ওসব আমার!”

কিন্তু ভিক্টর বাক্সটি স্পর্শ করার আগেই কবরস্থানের চারপাশ থেকে তীব্র সার্চলাইটের আলো তাদের ওপর এসে পড়ল। সাইরেনের কর্কশ শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা চুরমার হয়ে গেল এবং পাইন বনে ছড়িয়ে পড়ল নীল-লাল আলোর ঝলকানি।

“পুলিশ! কেউ নড়বেন না! অস্ত্র ফেলে মাটিতে শুয়ে পড়ুন!”

মুহূর্তের মধ্যে ডজনখানেক সশস্ত্র পুলিশ সদস্য ভিক্টর ও কার্লকে ঘিরে ফেলল।

প্রকৃতপক্ষে, ড্যানিয়েল কোনো প্রস্তুতি ছাড়া নিজের জীবন বাজি রাখার মতো নির্বোধ ছিল না। এক সপ্তাহ আগে সে যখন ভিক্টরকে নিজের পুরোনো বাড়ির কাছে সন্দেহভাজন কিছু লোকের সাথে কবরস্থানের নকশা দেখতে পেয়েছিল, তখনই সে শহরের সৎ পুলিশ প্রধান মিলারকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়েছিল। পুলিশ প্রধান মিলার সারাহকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন। তিনি ড্যানিয়েলের ফোনে একটি গোপন ট্র্যাকার ও ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম সক্রিয় করে দিয়েছিলেন, যা ড্যানিয়েল পকেটে চেপে দেওয়া মাত্রই পুলিশ বাহিনী কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়।

কবর অবমাননা ও ডাকাতির চেষ্টার অপরাধে ভিক্টর ও তার সাগরেদকে হাতেনাতে হাতকড়া পরানো হলো। ভিক্টরের মুখ লজ্জা ও পরাজয়ে সম্পূর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে চিৎকার করে নিজের প্রভাবের কথা বলতে লাগল, কিন্তু আইনের কঠোর বাঁধন তার একটি কথাও না শুনে তাকে সোজা পুলিশের গাড়িতে তুলে নিল।

ভোরের প্রথম আলো পাইন গাছের ডালপালা ভেদ করে সেই কবরস্থানে নেমে এল। কুয়াশা ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছিল আর কবরের পাথরে জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো মুক্তোর দানার মতো ঝলমল করছিল।

পুলিশ প্রধান মিলার ও একজন সরকারি ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সেই স্টিলের বাক্সটি খোলা হলো। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল শহরের সবচেয়ে বড় ব্যাংকের সিলমোহরযুক্ত নথি। সেটি ছিল সারাহর আসল এবং ভিডিও-রেকর্ড করা প্রকৃত উইল, যা তিনি দেশের সবচেয়ে নামী নোটারির মাধ্যমে আগেই নথিভুক্ত করিয়ে রেখেছিলেন। তাতে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল যে সারাহ নিজের ভাইয়ের অপরাধপ্রবণ স্বভাব সম্পর্কে আগে থেকেই সন্দিহান ছিলেন, তাই তিনি তাঁর সমস্ত পৈতৃক সম্পত্তি, বাড়ি এবং মায়ের কাছ থেকে পাওয়া ঐতিহাসিক হীরে-জহরত একমাত্র ছেলে ড্যানিয়েলের নামে করে গেছেন। একই সাথে সেই বাক্সে ছিল ভিক্টরের বহু পুরোনো আর্থিক জালিয়াতি এবং সারাহকে বিষ প্রয়োগ করে ধীরে ধীরে অসুস্থ করে তোলার এক গভীর ষড়যন্ত্রের অকাট্য নথিপত্র, যা ভিক্টরকে জীবনের বাকি দিনগুলো কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে কাটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল।

তবে সেই হীরে আর উইলের দলিলের ঠিক ওপরে রাখা ছিল একটি ছোট্ট ভাঁজ করা চিঠি।

কাঁপতে থাকা হাতে ড্যানিয়েল চিঠিটি খুলল। তাতে লেখা ছিল তাঁর মায়ের সেই চিরচেনা মমতাভরা হাতের লেখা:

“আমার স্নেহের ড্যানিয়েল,

তুমি যদি এই চিঠি পড়ে থাকো, তবে তার অর্থ হলো তোমার মায়ের বিশ্বাস জয়ী হয়েছে আর অন্যায়ের অবসান ঘটেছে। আমি জানতাম আমার চলে যাওয়ার পর এই নিষ্ঠুর সমাজ তোমাকে দুর্বল ভাববে। আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো যে আমাকে এমন এক অদ্ভুত পথ বেছে নিতে হয়েছিল। তবে আমি জানতাম, যে ছেলে প্রতি রাতে মায়ের বুকে মাথা না রেখে ঘুমাতে পারত না, সে কোনোদিন তার মাকে একা ফেলে যাবে না। তোমার এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই ছিল তোমার সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। আর ওই ঠান্ডা পাথরে ঘুমানোর কোনো প্রয়োজন নেই আমার বাছা। এই বাড়ি তোমার, এই সমস্ত সম্পদ তোমার। যাও, মাথা উঁচু করে বাঁচো, সুন্দর এক জীবন গড়ে তোলো। আর যখনই তোমার আমার কথা মনে পড়বে, রাতের এই ঠান্ডা পাথরে এসো না—বরং ভোরের মিষ্টি রোদে চোখ দুটো বন্ধ কোরো, তুমি আমাকে সর্বদা তোমার নিঃশ্বাসে হাসিমুখে অনুভব করতে পারবে…”

ড্যানিয়েল চিঠিটি বুকের সাথে চেপে ধরল। কয়েকমাস ধরে তার চোখে যে কান্না পাথরের মতো জমে ছিল, আজ তা এক পবিত্র নদীর মতো গাল বেয়ে ঝরে পড়ল। তবে এই কান্নায় কোনো যন্ত্রণা, হাহাকার কিংবা অসহায়ত্ব ছিল না; এতে ছিল এক মায়ের অমর ভালোবাসার বিজয়ের পরম প্রশান্তি।

পুলিশ প্রধান মিলার এগিয়ে এসে ড্যানিয়েলের কাঁধে হাত রাখলেন। তাঁর চোখও ছিল অশ্রুসজল। “বাবা, তোমার মা তোমাকে শুধু সম্পদ দিয়ে যাননি, তিনি শিখিয়ে গেছেন যে প্রকৃত ভালোবাসা পৃথিবীর যেকোনো অন্ধকারের চেয়ে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী। চলো, এবার নিজের ঘরে ফিরে চলো।”

সূর্য তখন পুরোপুরি আকাশে ডানা মেলেছে। কবরস্থানের সেই নির্জনতাকে আর ভুতুড়ে মনে হচ্ছিল না; তা যেন কোনো পবিত্র তীর্থের মতো সোনালি রোদে স্নান করছিল। ড্যানিয়েল শেষবারের মতো সেই পাথরটি ছুঁয়ে দেখল, মাকে জানাল এক গভীর ও শান্ত অন্তিম প্রণাম, তারপর কবরস্থানের ফটক পেরিয়ে বেরিয়ে এল—এক বিজয়ী বীরের মতো, যার মায়ের অদৃশ্য ছায়া তাকে অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে টেনে তুলে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল এক নতুন ও উজ্জ্বল সোনালি সকালের মুখোমুখি।

-

You Might Also Enjoy