Story

চেকআউট লাইনে ৮৩ বছর বয়সী মায়ের প্রকাশ্য অপমান, কিন্তু ক্যাশিয়ার কাউন্টার লক করে চিৎকার করে উঠলেন “কেউ বাইরে যাবে না” — যখন সেই পুরোনো বাক্সটি খোলা হলো, কেঁদে ফেলল গোটা সুপারমার্কেট

আমার তিরাশি বছর বয়সী মা, মার্গারেট, নিজের শর্তে বাঁচা একজন মানুষ ছিলেন। জীবনের এই প্রান্তে এসে যখন হাড় দুর্বল হয়ে যায় এবং স্মৃতিশক্তি ঝাপসা হতে থাকে, তখনও মা নিজের আত্মনির্ভরশীলতাকে কোনো অমূল্য রত্নের মতো আগলে রাখতেন। তাঁর কাছে জীবন কেবল শ্বাস-প্রশ্বাসের নাম ছিল না, বরং নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক নিরন্তর সংগ্রাম ছিল। ডাক্তার তাঁকে ভারী জিনিস তুলতে বা একা বাইরে বেরোতে কড়াভাবে বারণ করেছিলেন, কিন্তু শনিবার এলেই তিনি তাঁর পুরোনো, ফুলছাপ কাপড়ের থলেটি হাতে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যেতেন। আমি প্রায়ই বলতাম, “মা, এখন ইন্টারনেটের যুগ, মোবাইলের একটা বোতাম টিপলেই সব মুদিখানা ঘরের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছায়।” কিন্তু তিনি মৃদু হেসে মাথা নাড়তেন। তাঁর কথা ছিল, যতক্ষণ না মানুষ নিজের চোখে টাটকা আপেল বেছে নেয়, শাকসবজির ঘ্রাণ না শোঁকে এবং বাইরের পৃথিবীর মানুষের মুখ না দেখে, ততক্ষণ সে নিজেকে জীবিত অনুভব করবে কীভাবে? বাজারে যাওয়া তাঁর জন্য শুধুই ঘরের জিনিসপত্র কেনা ছিল না; বরং এটা প্রমাণ করার এক মাধ্যম ছিল যে তিনি এখনও এই পৃথিবীর এক সক্রিয় এবং জীবন্ত অংশ।

সেই শনিবার দিনটি একটু অন্যরকম ছিল। মাসের প্রথম সপ্তাহ হওয়ায় সেই বিশাল সুপারমার্কেটে ছিল উপচে পড়া ভিড়। চারিদিকে ট্রলির চাকার ঘড়ঘড় শব্দ, বিলিং কাউন্টার থেকে একটানা বিপ-বিপ আওয়াজ, বাচ্চাদের কান্নার রোল আর সপ্তাহান্তের তাড়াহুড়োতে থাকা মানুষের কোলাহল প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। পরিবেশের মধ্যে এক অদ্ভুত অস্থিরতা এবং অধৈর্য ভেসে বেড়াচ্ছিল। মা তাঁর দুর্বল কোমরে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে মাত্র ছ’টি জিনিস বেছে নিয়েছিলেন—আধ গ্যালন খাঁটি দুধ, এক প্যাকেট ওটস, তাঁর পছন্দের চা-পাতা, দুটি লাল আপেল, এক প্যাকেট ছোট পাউরুটি এবং আমার জন্য পায়েস বানানোর উদ্দেশ্যে রাখা এক ছোট কৌটো চিনি। আমরা দুজন চার নম্বর চেকআউট লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। লাইনটি বেশ লম্বা ছিল এবং এগোনোর গতি ছিল অত্যন্ত মন্থর। মাকে কিছুটা ক্লান্ত দেখাচ্ছিল, তাঁর হাঁটু কাঁপছিল, কিন্তু তাঁর মুখে ছিল সেই পুরোনো, তৃপ্তিময় হাসি। মানুষদের দেখতে, শিশুদের দিকে হাত নাড়তে এবং লাইনে দাঁড়ানো অপরিচিতদের দিকে মৃদু হাসির পরশ বুলিয়ে দিতে তিনি খুব ভালোবাসতেন।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে আমাদের পালা এল। মা তাঁর কাঁপতে থাকা হাতে ধীরে ধীরে এক-একটি জিনিস কনভেয়ার বেল্টের ওপর রাখলেন। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে বার্ধক্যের জড়তা এবং ধীরগতি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। ক্যাশিয়ার যখন শেষ জিনিসটি স্ক্যান করে মোট টাকার অঙ্ক জানালেন, মা তাঁর পুরোনো চামড়ার হ্যান্ডব্যাগের জিপ খুললেন যাতে মানিব্যাগটি বের করতে পারেন। কিন্তু ব্যাগে হাত ঢোকানো মাত্রই তাঁর মুখখানা কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মানিব্যাগটি ব্যাগের তলায় কোনো একটা কোণে আটকে গিয়েছিল। বয়সের ভারে আঙুলের নমনীয়তা হারিয়ে গিয়েছিল, বাতজনিত ব্যথার কারণে গাঁটগুলো ফুলে উঠেছিল এবং তিনি সহজে কিছু আঁকড়ে ধরতে পারছিলেন না। মা ঘাবড়ে গেলেন। তিনি যত তাড়াহুড়ো করে খোঁজার চেষ্টা করছিলেন, তাঁর হাত যেন আরও বেশি করে কাঁপছিল।

ঠিক আমাদের পেছনেই এক মহিলা দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর বয়স আনুমানিক চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি হবে। গায়ে ছিল অতি মূল্যবান ও জমকালো পোশাক, চোখে ডিজাইনার রোদচশমা এবং দুই হাতে সোনার মোটা চুড়ি জ্বলজ্বল করছিল। তাঁর ট্রলিটি দামি ওয়াইন, বিদেশি চিজ, বহুমূল্য ফ্রোজেন মিট আর নানারকম বিলাসবহুল পণ্যে ঠাসা ছিল—যেন তিনি সারা মাসের খোরাক এক দিনেই লুটে নিতে চান। মায়ের মানিব্যাগ বের করতে বাড়তি কয়েক সেকেন্ড দেরি হতেই সেই মহিলা নাক কুঁচকে অত্যন্ত জোরালো ও নাটকীয় ভঙ্গিতে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“আরে ভাই, একটু তাড়াতাড়ি করুন! সারা দিন কি এখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাটবে?” তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট ফুটে উঠছিল তীব্র কটাক্ষ আর অহংকার।

মা ইতস্তত করে পেছন ফিরে তাকালেন। তাঁর চোখে লজ্জা ও অস্বস্তির এক গভীর ছায়া নেমে এল। কাঁপাকাঁপা গলায় তিনি সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা চাইলেন, “আমাকে মাফ করবেন, মা… আসলে মানিব্যাগটা নিচে কোথাও চাপা পড়ে গেছে, আমি এখনই বের করছি।”

কিন্তু সেই বিনীত ক্ষমা প্রার্থনার ওই মহিলার ওপর বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়ল না। উল্টে তাঁর মুখে বিরক্তি আর ঘৃণার ছাপ আরও গভীর হয়ে উঠল। তিনি তাঁর ভারী ধাতব ট্রলিটিকে সজোরে সামনের দিকে ধাক্কা দিলেন, যার চাকা মায়ের পায়ের একেবারে গা ঘেঁষে কোনোমতে রক্ষা পেল। মহিলা তাঁর থুতনি উঁচু করে লাইনের সবাইকে শুনিয়ে কর্কশ কণ্ঠে বললেন, “যদি এতটাই বুড়ি আর অক্ষম হয়ে গিয়ে থাকেন যে নিজের ব্যাগটাও সামলাতে পারেন না, তবে নিজের এই হাড়গোড় নিয়ে ঘরেই বসে থাকুন না কেন! আপনাদের মতো মানুষদের জন্য গোটা পৃথিবীর কাজ থমকে যায়। অন্যের অমূল্য সময় নষ্ট করার কোনো অধিকার আপনার নেই।”

তাঁর গলার আওয়াজ এতটাই তীব্র আর বিষাক্ত ছিল যে আশেপাশের দু-তিনটি লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন পুরোপুরি নিস্তব্ধ হয়ে গেল। চারদিকে এক থমথমে নীরবতা নেমে এল। অনেকে ঘুরে ঘুরে আমাদের দিকে তাকাতে লাগল। কারও কারও চোখে সহমর্মিতা ছিল, কিন্তু সেই অহংকারী মহিলাকে মুখের ওপর থামানোর সাহস কারও হলো না; প্রত্যেকে কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল। আমার রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করল। এক সন্তানের পক্ষে নিজের বৃদ্ধা ও অসহায় মায়ের এমন অপমান সহ্য করা ছিল অসম্ভব।

আমি ক্ষোভের সাথে ঘুরে তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বললাম, “মাফ করবেন! আপনি কার সাথে এবং কী ভাষায় কথা বলছেন? গুরুজনদের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় সেটুকু ভদ্রতাও কি শেখেননি? মাত্র কয়েক সেকেন্ড দেরির জন্য আপনি প্রকাশ্যে কাউকে এভাবে অপমান করতে পারেন না!”

সেই মহিলা বিদ্রূপের সাথে চোখ বাঁকিয়ে, বুকে হাত বেঁধে নির্লজ্জের মতো হাসলেন, “ওহ, তাই নাকি? আমি তো কিছু ভুল বলিনি। এখানে লাইনে দাঁড়ানো প্রতিটি মানুষ যা ভাবছে, আমি শুধু সেটাই মুখে বলেছি; অন্যদের শুধু মুখ খোলার সাহস নেই। আমাদের নিজস্ব জীবন আছে, জরুরি কাজ আছে, আমরা কোনো বুড়ির নাটক দেখার জন্য এখানে ফালতু দাঁড়িয়ে নেই।”

মায়ের মুখের রঙ পুরোপুরি উড়ে গিয়েছিল। তাঁর আত্মসম্মান ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছিল। চোখের কোণ থেকে দুই ফোঁটা জল নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ে গালের বলিরেখায় মিলিয়ে গেল। তাঁর কাঁপতে থাকা হাতগুলো এবার পুরোপুরি অবশ হয়ে আসছিল। কোনোমতে ব্যাগের গভীর থেকে মানিব্যাগটি বের করে তিনি তাঁর পুরোনো ডেবিট কার্ডটি টেনে আনলেন। মা অত্যন্ত সঙ্কোচ ও কুণ্ঠিত চিত্তে ক্যাশিয়ারের দিকে কার্ডটি বাড়িয়ে দিলেন, যেন কোনো জঘন্য অপরাধ করার পর তিনি করুণার ভিক্ষা চাইছেন।

কিন্তু কার্ডটি সামনে বাড়াতেই পেছনের সেই মহিলা এক বীভৎস ও ঝাঁঝালো অট্টহাসি দিলেন। “অবিশ্বাস্য! আমরা সবাই গত দশ মিনিট ধরে এই ভাঙাচোরা কার্ডের জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি? ঈশ্বরই জানেন এর অ্যাকাউন্টে দুটো পয়সাও আছে কি না, নাকি মেশিনও রিজেক্ট হয়ে গিয়ে আমাদের আরও আধ ঘণ্টা সময় নষ্ট করাবে!”

ঠিক সেই মুহূর্তে, চেকআউট কাউন্টারে বসে থাকা মহিলা ক্যাশিয়ার প্রথমবারের মতো নিজের মুখ তুলে তাকালেন।

সেই ক্যাশিয়ারের বয়স প্রায় পঞ্চাশের কোঠায়। তাঁর মুখে জীবনের কঠিন পরিশ্রম, সংগ্রাম আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ছিল, কিন্তু চোখ দুটি ছিল গভীর ও ভাবুক। তাঁর নেমপ্লেটে আবছা অক্ষরে লেখা ছিল ‘অ্যানা’। অ্যানা চোখ তুলে সরাসরি মায়ের মুখের দিকে তাকালেন।

মায়ের সেই নীল, পরিশ্রান্ত এবং অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে তাকাতেই অ্যানার গোটা শরীরে যেন এক তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বয়ে গেল। অ্যানার শ্বাস যেন গলায় আটকে এল। তাঁর মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল এবং তিনি পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। তিনি মায়ের মুখের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইলেন যেন বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া কোনো অলৌকিক দৃশ্য হঠাৎ চোখের সামনে দেখতে পেয়েছেন।

অ্যানা কাঁপাকাঁপা গলায়, প্রায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার… আপনার নাম কী?”

মা অত্যন্ত দ্বিধা ও অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। এমন অপমানের পর হঠাৎ এই প্রশ্ন শুনে তিনি ধীরে ধীরে মাথা তুলে মৃদু স্বরে বললেন, “মার্গারেট… আমার নাম মার্গারেট থম্পসন।”

‘মার্গারেট থম্পসন’ নামটা শোনা মাত্রই অ্যানার চোখে যেন এক বাঁধভাঙা কান্নার ঢেউ আছড়ে পড়ল। তাঁর চোখের মণি বিস্ফারিত হলো। চোখের পলকে তাঁর মুখের সমস্ত অভিব্যক্তি বদলে গেল। সেখানে আর কোনো সঙ্কোচ ছিল না, কোনো দ্বিধা ছিল না; বরং এক পাহাড়সম দৃঢ়তা ও সুরক্ষার ভাব জেগে উঠল।

অ্যানা এক মুহূর্তও নষ্ট না করে কাউন্টারের নিচে থাকা প্রধান নিরাপত্তা প্যানেলের দিকে হাত বাড়ালেন।

ক্লিক।

এক ভারী এবং গমগমে ধাতব শব্দের সাথে সাথে তাঁর পুরো ডিজিটাল ক্যাশ রেজিস্টার লক হয়ে গেল। স্ক্রিনের লাল আলো জ্বলে উঠে বন্ধ হয়ে গেল পুরো সিস্টেম। ঠিক পরক্ষণেই, অ্যানা ডান হাত দিয়ে কনভেয়ার বেল্টের প্রধান সুইচটি নামিয়ে দিলেন। এক ঝাঁকুনি দিয়ে পুরো মেশিনটি থেমে গেল।

অ্যানা নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে, বিশেষ করে সেই অহংকারী মহিলার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে বরফের মতো শীতল, ভারী ও দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন:

“এখান থেকে এখন কেউ বাইরে যাবে না। কেউই না।”

পুরো দোকানে যেন এক নিথর স্তব্ধতার চাদর বিছিয়ে গেল। পেছনের সেই বদমেজাজি মহিলার রাগ তখন সপ্তমে চড়েছে। তিনি ক্ষোভে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন, “কী আজেবাজে নাটক হচ্ছে এসব? তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? রসিকতা করছ আমার সাথে? আমার সময় নষ্ট হচ্ছে, আমার এখনই বিলিং চাই! নিজের চাকরিটা খোয়াবে তুমি, বুঝতে পারছ?”

কিন্তু অ্যানা তখন তাঁর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছেন না। তিনি সেই মহিলার অস্তিত্বকে এমনভাবে অগ্রাহ্য করলেন যেন সেখানে কেউ ছিলই না। কাউন্টারে থাকা ইন্টারকমের রিসিভার তুলে তিনি স্টোর ম্যানেজারের বিশেষ কোড ডায়াল করলেন এবং রিসিভারটি মুখের কাছে এনে অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর গলায় কিছু বললেন যা আমরা শুনতে পেলাম না। তাঁর কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত উত্তেজনা। তিনি শুধু বললেন, “স্যার, চার নম্বর লেনে এখনই আসুন। সেই… সেই মহিলাই এখানে এসেছেন। আর আলমারিতে রাখা সেই বাক্সটাও সাথে নিয়ে আসবেন।”

ফোন রেখেই অ্যানা কাউন্টারের ছোট কাঠের পাল্লা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলেন। চিৎকার করা সেই মহিলার কথার বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান কানাঘুষোর কোনো তোয়াক্কাই তিনি করলেন না। তিনি সরাসরি আমার মায়ের কাছে এলেন, নিজের দু’হাত দিয়ে মায়ের কাঁপতে থাকা ঠান্ডা হাত দুটি জড়িয়ে ধরে গভীর শ্রদ্ধায় মাথা সামান্য নত করলেন। মা পুরোপুরি হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন; এই গমগমে দোকানে কী ঘটছে তিনি কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। আমি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “শুনুন, ব্যাপারটা কী? আপনি আমার মাকে এভাবে আটকে রাখছেন কেন?”

অ্যানা আমার দিকে তাকালেন, তাঁর চোখ তখন জলে ছলছল করছে। পরম শ্রদ্ধার সাথে তিনি বললেন, “ভাই, কেবল দু’টি মিনিট একটু ধৈর্য ধরুন। আজ এই গোটা দোকানের, আর বিশেষ করে ওই অন্ধ অহংকারী মহিলার জানা দরকার যে মানবতার আসল মূল্য কী।”

দু’মিনিটও কাটেনি, সুপারমার্কেটের পেছনের মূল অফিসের ভারী দরজাটা খুলে গেল। স্টোরের জেনারেল ম্যানেজার, মিস্টার ডেভিড—যার চুল পুরোপুরি সাদা হয়ে গেছে এবং যাকে সচরাচর অত্যন্ত রাশভারী ও কঠোর প্রশাসক হিসেবে সবাই চেনে—প্রায় দৌড়ে চার নম্বর কাউন্টারের দিকে আসছিলেন। তাঁর চেহারায় ছিল এক রাশ উদ্বেগ আর গভীর কৌতূহল। তাঁর দু’হাতে ধরা ছিল পুরোনো, ধুলোবালি মাখা, হলদেটে হয়ে যাওয়া এক কার্ডবোর্ডের বাক্স। সেই বাক্সের কোণগুলোতে পুরোনো আমলের বাদামি রঙের সেলোটেপ লাগানো ছিল, যেন কয়েক দশক ধরে কোনো অতি সুরক্ষিত সিন্দুকের মতো সেটিকে আগলে রাখা হয়েছে।

মিস্টার ডেভিড হাঁপাতে হাঁপাতে এসে পৌঁছালেন। নিজের শ্বাস সামলে তিনি অ্যানার দিকে তাকালেন। অ্যানা কোনো কথা না বলে শুধু আঙুল তুলে আমার মাকে দেখিয়ে দিলেন। ডেভিড মায়ের মুখের দিকে তাকালেন—সেই বলিরেখা, করুণাভরা সেই চোখ আর সেই শান্ত সারল্য। ডেভিডের চোখও জলে ভিজে উঠল। তিনি তাঁর টাই সামান্য আলগা করলেন এবং পরম বিনম্রতার সাথে সেই পুরোনো বাক্সটি কনভেয়ার বেল্টের ওপর রাখলেন।

পেছনে দাঁড়ানো ধনী মহিলা ততক্ষণে নিজের ধৈর্য পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছেন। দু’হাত নেড়ে চিৎকার করে উঠলেন, “ম্যানেজার! ভালোই হয়েছে তুমি এসেছ! তোমার এই বেয়াদব ক্যাশিয়ার পুরো সিস্টেম বন্ধ করে রেখেছে, আমাকে যেতে দিচ্ছে না আর তুমি এখানে কোনো আস্তাকুঁড়ের বাক্স নিয়ে ঢং করছ! আমি এই শহরের মেয়রকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তোমাদের এই জঘন্য দোকানের নামে এমন মামলা ঠুকব যে তোমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করবে! এই বুড়ি মহিলার আগে আমাকে এখান থেকে ছাড়ো!”

মিস্টার ডেভিড ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখে কোনো রাগ ছিল না, বরং ছিল এমন এক গভীর ঘৃণা ও তাচ্ছিল্য যা চরম সংকীর্ণমনা মানুষদের জন্য জন্মায়। ডেভিড অত্যন্ত শান্ত কিন্তু বজ্রকঠিন কণ্ঠে বললেন, “ম্যাডাম, আপনার যদি এতই তাড়া থাকে, তবে আপনার এই বোঝাই করা ট্রলি এখানেই ফেলে রেখে এই মুহূর্তে স্টোর থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন। কারণ এই দোকানের কাছে আপনার এই অর্থসম্পদের কোনো মূল্য নেই। কিন্তু এই কাউন্টারে, এই মুহূর্তে, পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন। আর যতক্ষণ না আমরা তাঁর ঋণ শোধ করছি, ততক্ষণ এই রেজিস্টার চালু হবে না।”

মহিলার মুখ হাঁ হয়ে গেল। তাঁর সমস্ত আওয়াজ গলায় আটকে গেল। লাইনে দাঁড়ানো বাকি মানুষজনও স্তম্ভিত হয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে এল। সবাই দেখতে চাইছিল সেই বাক্সে এমন কী রহস্য লুকিয়ে আছে যা গোটা দোকানের কাজ থামিয়ে দিল।

মিস্টার ডেভিড কাঁপাকাঁপা হাতে সেই কার্ডবোর্ডের বাক্সের টেপটি খুললেন। বাক্সের ঢাকনা খুলতেই পুরোনো বই আর প্রাচীন কাগজের এক চেনা, ঐতিহাসিক ঘ্রাণ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। ডেভিড সেই বাক্সের ভেতর থেকে একটি পুরোনো, ময়লাটে ডায়েরি, কিছু পুরোনো খবরের কাগজের টুকরো, বেশ কয়েকটি হাতে লেখা চিঠি এবং সবার ওপরে রাখা একটি সাদা-কালো ছবি বের করলেন।

ডেভিড সেই ছবিটি তুলে লাইনে দাঁড়ানো সবার সামনে ঘুরিয়ে ধরলেন যাতে প্রত্যেকে দেখতে পায়। ছবিটি ছিল প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের। সেখানে কাঠের তৈরি একটি ছোট্ট পুরোনো মুদি দোকান দেখা যাচ্ছিল, যার সাইনবোর্ডে লেখা ছিল ‘থম্পসন গ্রোসারি স্টোর’। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন সুন্দর, মায়াবী হাসিমুখের এক নারী, যার চোখেমুখে ছিল সেই একই অপার মাতৃত্ব যা আজ আমার তিরাশি বছরের মায়ের মুখে দেখা যায়। আর সেই নারীর দু’পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ছেঁড়াখোঁড়া নোংরা পোশাক পরা, ক্ষুধায় কাতর দুটি ছোট শিশু—একটি বছর পনেরোর মেয়ে এবং অন্যটি দশ বছরের এক ছোট ছেলে।

মা যখন সেই ছবিটি দেখলেন, তাঁর শুকনো ঠোঁট থেকে এক মৃদু আর্তনাদ বেরিয়ে এল। তিনি নিজের মুখে হাত চাপা দিলেন। “হে ঈশ্বর… এ… এতো আমার পুরোনো দোকান।”

অ্যানা এগিয়ে এসে নিজের চোখ মুছে বললেন, “হ্যাঁ, মিসেস মার্গারেট। এটি আপনার সেই দোকান যা আপনি পঁয়ত্রিশ বছর আগে চালাতেন। আর সেই ছবিতে আপনার বাঁ হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই পনেরো বছরের সর্বহারা মেয়েটি… আর কেউ নয়, আমি। আর আপনার ডান হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে থাকা সেই ক্ষুধার্ত অনাথ বালকটি ছিল এই স্টোরের ম্যানেজার, ডেভিড।”

দোকানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের গায়ের রোম খাড়া হয়ে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা ডজন ডজন ক্রেতার শ্বাস যেন একসাথে থমকে গেল। এমনকি সেই অহংকারী মহিলাও পাথরের মতো জমে গেলেন; তাঁর চোখের ধূর্ততা হঠাৎ এক অজানা ভয়ে রূপান্তরিত হতে লাগল।

অ্যানা লাইনের সমস্ত মানুষের দিকে মুখ ফিরিয়ে ভারী গলায় বলতে শুরু করলেন, তাঁর প্রতিটি কথা সেই নিস্তব্ধতাকে চিরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল:

“পঁয়ত্রিশ বছর আগে, এই শহরের সবচেয়ে অনুন্নত এবং বরফে ঢাকা এক কোণে আমাদের মা আমাদের ফেলে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। আমাদের মদ্যপ বাবা তারও অনেক আগে আমাদের ফেলে পালিয়েছিলেন। ডেভিড তখন মাত্র দশ বছরের এক শিশু, আর আমার বয়স পনেরো। আমাদের না ছিল মাথা গোঁজার মতো কোনো পাকা ছাদ, না ছিল মুখে দেওয়ার মতো একমুঠো অন্ন। বাইরে হাড়কাঁপানো শীত আর বরফ পড়ছিল, আর ডেভিড ক্ষুধার জ্বালায় মেঝেতে পড়ে বমি করছিল, তার শরীরে আর কোনো প্রাণ অবশিষ্ট ছিল না। সেই রাতে যদি আমরা খাবার না পেতাম, তবে পরদিন সকালে বরফের নিচ থেকে ডেভিডের লাশ উদ্ধার হতো।”

অ্যানার গলা বুজে এল, কিন্তু তিনি বলে চললেন: “আমি পাগলের মতো সেই বরফঢাকা রাতে রাস্তায় ছুটে বেরিয়েছিলাম। শহরের প্রতিটি বড় মহাজন, ধনী ব্যবসায়ী আর বড় সুপারমার্কেটের দরজায় কড়া নেড়েছিলাম। মানুষের জুতো পর্যন্ত ছুঁয়ে মিনতি করেছিলাম যে শুধু দুটো শুকনো রুটি বা এক টুকরো পাউরুটি দিন যাতে আমার ছোট ভাইটা বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু প্রত্যেকে আমাকে নিজেদের দোকান থেকে কুকুরের মতো তাড়িয়ে দিয়েছিল। কেউ বলেছিল, ‘তোমাদের মতো ভিখারিদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই’, আবার কেউ পুলিশ ডাকার হুমকি দিয়েছিল। ঠিক যেভাবে আজ এই মহিলা আমার এই মাকে তাচ্ছিল্য করলেন।”

অ্যানা তাঁর তর্জনী সেই ধনী মহিলার দিকে তাক করলেন, যিনি ততক্ষণে চরম লজ্জা ও অস্বস্তিতে মাথা নিচু করতে শুরু করেছেন।

“সেই ভয়াল রাতে,” অ্যানা মায়ের হাত চুম্বন করে বললেন, “যখন আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলাম এবং আত্মহত্যার কথা ভাবছিলাম, তখনই রাস্তার ওপারে ‘থম্পসন গ্রোসারি’র একটি ক্ষীণ আলো জ্বলতে দেখেছিলাম। মিসেস মার্গারেট দোকান বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আমি কাঁপতে কাঁপতে তাঁর কাউন্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার হাত দুটো খালি ছিল, পকেটে একটা কানাকড়িও ছিল না। আমি জীবনে প্রথমবারের মতো ক্ষুধা মেটানোর তাগিদে চুরি করার উদ্দেশ্যে কাউন্টারে রাখা একটি পাউরুটির প্যাকেট চাদরের নিচে লুকানোর চেষ্টা করি। কিন্তু শরীরের দুর্বলতার কারণে প্যাকেটটি আমার হাত ফসকে মেঝেতে পড়ে যায়।”

অ্যানার চোখ থেকে অবিরাম জল গড়িয়ে পড়ছিল। “মিসেস মার্গারেট আমাকে হাতেনাতে ধরে ফেললেন। সেই যুগে চুরির শাস্তি ছিল সরাসরি জেল। আমি মাটিতে পড়ে কেঁদে ভাসিয়ে দিলাম, প্রাণভিক্ষা চেয়ে বললাম যেন পুলিশে না দেন, আমার ভাই না খেয়ে মরে যাবে। কিন্তু জানেন এই দেবীসম নারী কী করেছিলেন? তিনি না আমার ওপর চিৎকার করেছিলেন, না আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, আর না বলেছিলেন যে ‘নিজের দারিদ্র্য নিয়ে ঘরে বসে থাকো’। তিনি আমাকে মাটি থেকে টেনে তুললেন, নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলেন, নিজের আঁচল দিয়ে আমার চোখের জল মুছে দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে দোকানের তাক থেকে গরম স্যুপের কৌটো বের করে আনলেন।”

ডেভিড সেই বাক্স থেকে একটি পুরোনো, দুমড়ানো-মুচড়ানো ডায়েরি বের করে বাতাসে তুলে ধরে বললেন, “মিসেস মার্গারেট সেই রাতে অ্যানার সাথে আমাদের সেই ভাঙা, স্যাঁতসেঁতে ঘরে এসেছিলেন। তিনি দেখলেন আমি ক্ষুধায় মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছি। তিনি নিজের হাতে আমাকে সেই গরম স্যুপ খাইয়েছিলেন। সেই রাতে তিনি শুধু আমাদের খাবারই খাওয়াননি, বরং পরবর্তী তিন বছর ধরে… যতদিন না অ্যানা আঠারো বছরে পা দিল আর আমি কিছুটা বড় হলাম… প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় তাঁর দোকান থেকে আমাদের ঠিকানায় চাল-ডালের একটি বড় বাক্স পৌঁছে যেত। সেই বাক্সে থাকত দুধ, তাজা ফল, বইখাতা আর শীতের গরম জামাকাপড়।”

ডেভিড ডায়েরিটি খুললেন। পুরোনো কালিতে সেখানে শত শত হিসাব লেখা ছিল। ডেভিড কাঁপাকাঁপা গলায় পড়ে শোনালেন, “‘১২ জানুয়ারি ১৯৮৯: অ্যানার স্কুলের বেতন — পরিশোধিত। ডেভিডের নতুন শীতের জ্যাকেট — পরিশোধিত। বাচ্চাদের পুরো মাসের রেশন — ঈশ্বরের কৃপায় পরিশোধিত।’ মিসেস মার্গারেট নিজে কোনো ধনী পরিবারের নারী ছিলেন না। তাঁর স্বামী ছিলেন একজন সাধারণ স্কুলশিক্ষক। কিন্তু তিনি তাঁর জমানো প্রতিটি পয়সা আমাদের মতো দুটি সর্বহারা, অনাথ শিশুকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং লেখাপড়া শেখাতে ব্যয় করেছিলেন। অ্যানা যখনই কেঁদে ফেলে তাঁকে বলত, ‘মিসেস মার্গারেট, আমরা আপনার এই ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না’, তখন তিনি শুধু হেসে একটি কথাই বলতেন…”

ডেভিড থামলেন, তাঁর চোখ আটকে ছিল মায়ের মুখের ওপর। মায়ের চোখ থেকেও তখন ঝরঝর করে জল পড়ছিল। মা মৃদু, কাঁপাকাঁপা গলায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের সেই কথাটি পূর্ণ করলেন:

“…’মা রে, পৃথিবীতে মানুষের ওপর মানুষের কোনো ঋণ থাকে না। জীবনে যদি কোনোদিন এমন সমর্থ হও যে কোনো পতনশীল মানুষকে सहारा দিতে পারো, তবে শুধু তার হাতটা শক্ত করে ধরিও। আমার ঋণ শোধ হয়ে যাবে।'”

গোটা সুপারমার্কেটে এমন এক নীরবতা নেমে এসেছিল যা কেবল মানুষের চাপা কান্নার শব্দেই ভাঙছিল। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বহু মানুষ রুমাল বের করে চোখ মুছছিলেন। যে তরুণ-তরুণীরা নিজেদের মোবাইল ফোনে বুঁদ হয়ে ছিলেন, তাঁরাও সম্পূর্ণভাবে এই দৃশ্যে আবিষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন।

ডেভিড সেই পুরোনো কার্ডবোর্ডের বাক্সটি আলতো করে বন্ধ করলেন এবং উপস্থিত জনতার সামনে, সেই ধনী মহিলার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন:

“যখন মিসেস মার্গারেটের স্বামী মারা গেলেন এবং বড় বড় শপিং মল গড়ে ওঠার কারণে তাঁর সেই ছোট দোকানটি বন্ধ হয়ে গেল, তখন আমরা দুজনে কোনোমতে এই শহরের অন্য প্রান্তে চলে আসি। আমরা দিন-রাত ঘাম ঝরিয়েছি, মেঝের ময়লা পরিষ্কার করেছি, বস্তা টেনেছি আর পড়াশোনা শেষ করেছি। আজ অ্যানা এখানকার সবচেয়ে প্রবীণ কর্মী আর আমি এই গোটা সুপারমার্কেটের জেনারেল ম্যানেজার। আমরা আমাদের জীবনে যা কিছু পেয়েছি, যে মর্যাদার আসনে দাঁড়িয়ে আছি, তা কেবল এবং কেবলমাত্র এই বৃদ্ধা, মহীয়সী মায়ের বদৌলতে—যাকে আজ আপনি আপনার নোংরা অর্থের অহংকারে ‘অক্ষম’ আর ‘ঘরে বসে থাকার যোগ্য’ বলে দাগিয়ে দিলেন!”

ডেভিডের কণ্ঠে এমন এক ক্রোধ এবং কর্তৃত্ব ছিল যে সেই ধনী মহিলা পুরোপুরি নির্বাক হয়ে গেলেন। তাঁর মুখ লজ্জা ও অনুশোচনায় লাল হয়ে উঠেছিল। যে হাতগুলো একটু আগেই অহংকারে ভারী ট্রলিটিকে ধাক্কা মারছিল, তা এখন কাঁপছিল। তিনি পেছনের মানুষের দিকে তাকালেন, কিন্তু প্রত্যেকের চোখেই তাঁর জন্য উপচে পড়ছিল শুধুই ঘৃণা আর ধিক্কার। তাঁর মুখ লুকোনোর কোনো জায়গা ছিল না। তাঁর ডিজাইনার চশমা, সোনার চুড়ি আর দামি ওয়াইনে ভরা ট্রলিটিকে সেই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে অর্থহীন ও কদর্য জিনিস বলে মনে হচ্ছিল।

মহিলা তোতলানো গলায় কিছু বলার চেষ্টা করলেন, “আ… আমি… আমি সত্যিই জানতাম না… আমি মাফ…”

“চুপ করুন, ম্যাডাম,” ডেভিড অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তাঁকে থামিয়ে দিলেন। “ক্ষমা আমার কাছে নয়, ওঁর কাছে চান—যার পায়ের ধুলো হওয়ার যোগ্যও আপনি নন। তবে তার আগে আমার একটি সিদ্ধান্ত শুনে যান।”

ডেভিড স্টোরের মূল মাইকের সুইচ অন করলেন, যার আওয়াজ সুপারমার্কেটের প্রতিটি কোণে, প্রতিটি গলিতে স্পষ্ট প্রতিধ্বনিত হলো:

“দোকানের সমস্ত সম্মানিত ক্রেতা এবং কর্মচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। চার নম্বর লেনে দাঁড়িয়ে থাকা মিসেস মার্গারেট থম্পসন… আজ, এখন থেকে এবং যতদিন এই স্টোর এই পৃথিবীর বুকে টিকে থাকবে, এঁর জন্য এই দোকানের প্রতিটি জিনিস, প্রতিটি পণ্য, আজীবন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ঘোষণা করা হলো। এটি কোনো দান নয়, এটি সেই অপার মাতৃত্ব ও মানবতার এক শতাংশ সুদও নয় যা তিনি পঁয়ত্রিশ বছর আগে এই শহরকে দিয়েছিলেন। আর যে নারী এইমাত্র এঁর অপমান করেছেন…”

ডেভিড মাইক হাতে সেই মহিলার দিকে তাকালেন,

“আপনাকে এই স্টোর থেকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ (Banned) করা হলো। আপনার এই কেনা পণ্য এখানেই নামিয়ে রাখা হবে। আপনি আপনার এই অহংকারী সম্পদ নিয়ে আমাদের স্টোর থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন; কারণ এই দোকান কেবল পণ্য বিক্রি করে না, এটি সেই সমস্ত মানুষের আস্থায় চলে যাদের বুকে হৃদয় ধড়ফড় করে, কোনো পাথর নয়।”

ডেভিডের ঘোষণা শেষ হতেই পুরো সুপারমার্কেটে এমন এক তুমুল করতালির ঝড় উঠল যা পুরো পরিবেশকে আবেগে ভাসিয়ে দিল। চারপাশের লাইন থেকে বেরিয়ে মানুষ এগিয়ে আসতে লাগল। কেউ মায়ের হাতে চুমু খাচ্ছিল, তো কেউ তাঁর পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিচ্ছিল। এক যুবক এগিয়ে এসে বলল, “মা, আজ আপনাকে দেখে বুঝতে পারলাম যে ঈশ্বর মানুষের মাঝে ঠিক কীভাবে বিরাজ করেন।”

সেই অহংকারী মহিলা আর সেখানে এক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। তিনি মাথা নিচু করে, নিজের উপচে পড়া ট্রলিটি ফেলে রেখে, চোখের জল আর অপমানে ডুবতে ডুবতে মূল দরজার দিকে পাগলের মতো দৌড়ে পালালেন। তাঁর চলে যাওয়ায় কারও বিন্দুমাত্র আক্ষেপ হলো না; তাঁর ফেলে যাওয়া নিঃসঙ্গ ট্রলিটি সেই অহংকারের প্রতীক হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল, যা মানবতার কাছে চিরকাল মাথা নত করতে বাধ্য হয়।

অ্যানা মায়ের সেই পুরোনো, ভাঙাচোরা ডেবিট কার্ডটি তুলে গভীর শ্রদ্ধায় মায়ের ব্যাগের ভেতর রেখে দিলেন। তিনি ব্যাগের জিপ বন্ধ করে সেটি মায়ের হাতে তুলে দিয়ে নিজের কপালে ছোঁয়ালেন।

“মা,” অ্যানা ভেজা চোখে হেসে বললেন, “আজকের পর আপনাকে আর কখনো এই ব্যাগ খোলার দরকার পড়বে না। আপনার ওই ছ’টি জিনিস… এবং আপনার জীবনের প্রতিটি প্রয়োজন, এখন থেকে আমাদের দায়িত্ব। ঈশ্বরের দরবারে আপনার খাতা আজীবনের জন্য পরিশোধিত হয়ে গেছে।”

মা অ্যানা এবং ডেভিড দুজনকেই পরম স্নেহে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর বৃদ্ধ, বলিরেখাভরা হাত দুটি আবার সেই দুজনের মাথায় একই মমতাময় স্পর্শ বুলিয়ে দিল, যা তিনি পঁয়ত্রিশ বছর আগের এক অন্ধকার, বরফঢাকা রাতে দিয়েছিলেন। মায়ের চোখ দিয়ে ঝরে পড়া জল আর অপমানের ছিল না; বরং তা ছিল সেই অপার আত্মতৃপ্তির, যা কেবল একজন মা-ই অনুভব করতে পারেন যখন তাঁর বোনা একমুঠো পুণ্যের বীজ কয়েক দশক পর এক বিশাল, ফলবান বটবৃক্ষ হয়ে গোটা পৃথিবীকে শীতল ছায়া দিতে শুরু করে।

আমি মায়ের হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিলাম। সেদিন আমি বুঝতে পারলাম, বয়স মানুষের শরীরকে দুর্বল করে দিতে পারে, তার চলার গতিকে শ্লথ করে দিতে পারে; কিন্তু মানুষ যদি জীবনে কোনো একটি ভেঙে পড়া আত্মাকেও নিঃস্বার্থভাবে স্পর্শ করে থাকে, তবে সময়ের কোনো আঘাত, পৃথিবীর কোনো অপমানই তাঁর সেই মর্যাদাকে কখনো মুছে দিতে পারে না। আমরা দুজন যখন সুপারমার্কেটের কাঁচের বিশাল দরজা ঠেলে বাইরে এলাম, তখন দুপুরের সোনালি রোদ মায়ের শুভ্র চুলে এক রাজমুকুটের মতো জ্বলজ্বল করছিল, আর পৃথিবীটাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর ও দয়ালু বলে মনে হচ্ছিল।

-

You Might Also Enjoy