১৪ বছরের কিশোরীর ১ মাস ধরে পেটব্যথা ও বমি, অস্ত্রোপচারে চিকিৎসকরা বের করলেন অবিশ্বাস্য জিনিস
১৪ বছরের এক কিশোরী এক মাসেরও বেশি সময় ধরে পেটব্যথা ও বমিতে ভুগছিল। সিটি স্ক্যানে দেখা যায়, তার পাকস্থলীর বেশিরভাগ অংশ জুড়ে একটি বিশাল “অজানা বস্তু” রয়েছে, যা ওপরের পেট থেকে নাভি পর্যন্ত বিস্তৃত।

ভারতে সম্প্রতি একটি বিরল ও চাঞ্চল্যকর চিকিৎসা ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। ১৪ বছরের এক কিশোরীর পাকস্থলী থেকে ২১০ সেন্টিমিটার লম্বা একটি বিশাল চুলের গুচ্ছ বের করতে চিকিৎসকদের জটিল অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে।
ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর প্রদেশের আগ্রা জেলার বারারা গ্রামের ওই কিশোরী এক মাসেরও বেশি সময় ধরে পেটব্যথা ও বমিতে ভুগছিল।
হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা প্রথমে ধারণা করেছিলেন যে তার পাকস্থলীতে অস্বাভাবিক কোনো টিউমার রয়েছে। কিন্তু সিটি স্ক্যানে দেখা যায়, পাকস্থলীর বেশিরভাগ অংশ দখল করে থাকা একটি বিশাল “বিদেশি বস্তু” ওপরের পেট থেকে নাভি পর্যন্ত বিস্তৃত।
পরবর্তী পরীক্ষা ও রোগের ইতিহাস জানার পর চিকিৎসকরা জানান, কিশোরীটি পাইকা (Pica) নামের একটি সমস্যায় ভুগছিল। এই অবস্থায় মানুষ খাবার নয় এমন জিনিস—যেমন মাটি, চক, চুল, সুতা এমনকি কাঠ—খাওয়ার প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণ অনুভব করে।
কিশোরীটির এই সমস্যা শুরু হয়েছিল ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়। সহপাঠীদের প্রভাবে সে ক্লাসরুমের চক গিলে খেতে শুরু করে। পরে এই অভ্যাস আরও বিপজ্জনক রূপ নেয় এবং সে চুল ও অন্যান্য বিদেশি বস্তু গিলে খেতে শুরু করে।
পাইকা নতুন কোনো রোগ নয়, তবে এর পরিণতি অনেক সময় মানুষ গুরুত্ব দিয়ে দেখে না।
এই কিশোরীর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে পাকস্থলীতে চুল জমতে জমতে একটি বিশাল “চুলের গুচ্ছ” তৈরি হয়। এর ফলে দেখা দেয় বিরল “রাপুনজেল সিনড্রোম”—যে অবস্থায় পাকস্থলীতে জমে থাকা বড় চুলের গুচ্ছ ক্ষুদ্রান্ত্র পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
চিকিৎসকদের মতে, এ কারণে অস্ত্রোপচারটি অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠে। অন্ত্র ফুটো হওয়া, সংক্রমণ বা পরিপাকতন্ত্রে বাধা সৃষ্টি হওয়ার মতো গুরুতর জটিলতা এড়াতে দ্রুত এবং দক্ষ চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল।
গত ২৭ মে, রাজস্থানের জয়পুরে অবস্থিত সাওয়াই মান সিং হাসপাতালের চিকিৎসকরা প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী ল্যাপারোস্কোপিক অস্ত্রোপচার করেন।
অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসকরা কিশোরীর শরীর থেকে একটি বিশাল চুলের গুচ্ছের পাশাপাশি রাবারের ব্যান্ড, সুতা, কাঠ এবং ছোট ছোট পাথরও বের করেন।

অস্ত্রোপচারের পর কিশোরীর শারীরিক অবস্থা ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
একজন মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞের মতে, পাইকা সিনড্রোম হলো এমন একটি খাওয়ার সমস্যা, যেখানে ব্যক্তি এমন বস্তু খায় যা খাবার হিসেবে বিবেচিত নয় এবং যার কোনো পুষ্টিগুণ নেই—যেমন বালি, কাগজ, চক, চুল বা কাঠ।
এই সমস্যা শিশুদের পরিপাকতন্ত্রে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে এবং তাদের স্বাভাবিক বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
পাইকা হওয়ার সম্ভাব্য কারণ
বর্তমানে পাইকার সুনির্দিষ্ট কারণ পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে কিছু বিষয় এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে:
- পুষ্টির ঘাটতি: শরীরে আয়রন, জিঙ্ক, ক্যালসিয়াম বা অন্যান্য ক্ষুদ্র পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি অস্বাভাবিক কিছু খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করতে পারে।
- অপুষ্টি বা দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত খাবারের অভাব: পুষ্টিকর খাবারের অভাবে মাটি বা কাদামাটি খাওয়ার ইচ্ছা হতে পারে।
- মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (OCD), সিজোফ্রেনিয়া বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD)-এর মতো সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে এ ধরনের আচরণ দেখা যেতে পারে।
- যত্নের অভাব ও মানসিক চাপ: শিশুর প্রতি পর্যাপ্ত মনোযোগের অভাব বা শিক্ষাজনিত ও পারিবারিক চাপও তাকে খাবার নয় এমন জিনিস খাওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
পাইকার সম্ভাব্য লক্ষণ ও জটিলতা
শিশু যদি নিয়মিত খাবার নয় এমন জিনিস খায়, তাহলে কী ধরনের বস্তু খেয়েছে তার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যেমন:
- বমি বমি ভাব
- পেটব্যথা
- কোষ্ঠকাঠিন্য
- ডায়রিয়া
- ক্লান্তি
- আচরণগত সমস্যা
এছাড়াও গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে:
- পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা: কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া এবং পুষ্টির ঘাটতি, বিশেষ করে আয়রন ও জিঙ্কের অভাব।
- সীসাজনিত বিষক্রিয়া: শরীরে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে এবং কিডনি, হৃদ্যন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে। পশুর মলমিশ্রিত মাটি বা বালি খাওয়া প্রাণঘাতীও হতে পারে।
- মুখের আঘাত: ধারালো বা শক্ত বস্তু গিলে ফেললে মুখ ও পরিপাকতন্ত্রে আঘাত লাগতে পারে।
পাইকা আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা
বিশেষজ্ঞরা জানান, পাইকার কোনো একক বা সরাসরি চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা নির্ভর করে সমস্যাটির মূল কারণের ওপর।
যদি পুষ্টির ভারসাম্যহীনতার কারণে পাইকা হয়ে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খনিজ ও ভিটামিনের ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে।
এছাড়াও কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে:
- মনস্তাত্ত্বিক হস্তক্ষেপ: আবেগজনিত সমস্যার কারণে পাইকা হলে কাউন্সেলিং, আচরণগত থেরাপি ও সাইকোথেরাপি করা যেতে পারে।
- ওষুধের চিকিৎসা: কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বুদ্ধিবৃত্তিক বা বিকাশজনিত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে চিকিৎসক ওষুধ দিতে পারেন।
- আচরণগত থেরাপি: আচরণগত সমস্যার সঙ্গে পাইকা সম্পর্কিত হলে মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
- শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন: শিশুকে অবহেলা করাও এই সমস্যার একটি কারণ হতে পারে। তাই বাবা-মায়ের উচিত সন্তানের সঙ্গে বেশি সময় কাটানো এবং নিয়মিত কথা বলা।
শিশু যদি বারবার খাবার নয় এমন কিছু খায়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সময়মতো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
সূত্র: Saostar, Znews