Other

আল্ট্রাসাউন্ড কক্ষে যে সত্য প্রকাশ পেল, তা ডিয়েগোর পুরো জীবন বদলে দিল

ডা. সালিনাসের কথা শুনে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

ডিয়েগোর মুখের ব্যঙ্গাত্মক হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

পাউলা আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, তার চোখে তখনও সেই আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টি।

কিন্তু ডাক্তার আবার বললেন,

“মিস্টার ডিয়েগো, আপনার স্ত্রীকে অভিযুক্ত করার আগে, আমি মনে করি আপনার কিছু বিষয় জানা দরকার।”

ডিয়েগো বিরক্ত হয়ে হাত গুটিয়ে দাঁড়াল।

“ডাক্তার, বিষয়টা খুব সহজ। দুই মাস আগে আমার ভ্যাসেকটমি হয়েছে। তাহলে এই বাচ্চা আমার হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।”

ডা. সালিনাস কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন,

“আপনি কি অস্ত্রোপচারের পর ফলো-আপ পরীক্ষা করিয়েছিলেন?”

ডিয়েগোর মুখ হঠাৎ বদলে গেল।

“কী পরীক্ষা?”

“ভ্যাসেকটমির পর নিশ্চিত হওয়ার জন্য বীর্য পরীক্ষা করা হয়, যাতে দেখা যায় এখনও শুক্রাণু রয়েছে কি না। অস্ত্রোপচারের সঙ্গে সঙ্গেই একজন পুরুষ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ্যা হয়ে যান না।”

ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

আমি ডিয়েগোর দিকে তাকালাম।

সে কোনো উত্তর দিল না।

ডাক্তার আবার স্ক্রিনের দিকে তাকালেন।

“আরও একটি বিষয় আছে।”

আমার বুক ধড়ফড় করতে শুরু করল।

“আমার বাচ্চার কী হয়েছে?”

ডাক্তার আমার দিকে তাকিয়ে নরমভাবে বললেন,

“আপনার বাচ্চা ঠিক আছে।”

আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

কিন্তু তিনি বাক্যটি শেষ করেননি।

তিনি আবার স্ক্রিনের দিকে ইঙ্গিত করলেন।

“সমস্যাটা বাচ্চাকে নিয়ে নয়। সমস্যাটা হলো গর্ভধারণের সময়কাল।”

ডিয়েগো হঠাৎ সামনে এগিয়ে এল।

“তার মানে?”

ডাক্তার তার ফাইলের দিকে তাকালেন।

“আপনার স্ত্রীর গর্ভধারণের সময়কাল হিসাব অনুযায়ী, শিশুটির ধারণ হওয়ার সময়টি আপনার ভ্যাসেকটমির আগের সময়ের সঙ্গে মিলছে।”

ঘরের মধ্যে সম্পূর্ণ নীরবতা নেমে এল।

আমি যেন কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

“কী বলছেন আপনি?” আমি কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম।

ডা. সালিনাস ব্যাখ্যা করলেন,

“প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, গর্ভধারণটি আপনার স্বামীর অস্ত্রোপচারের পরে ঘটেনি, যেমনটি আপনারা ভেবেছিলেন।”

ডিয়েগোর মুখ সাদা হয়ে গেল।

“না,” সে ফিসফিস করে বলল। “এটা সম্ভব নয়।”

ডাক্তার শান্তভাবে উত্তর দিলেন,

“এটি নিশ্চিত করার জন্য আরও পরীক্ষা করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে আপনার স্ত্রীর কথা সত্য হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।”

পাউলার মুখের হাসি অদৃশ্য হয়ে গেল।

সে ধীরে ধীরে ডিয়েগোর দিকে তাকাল।

“ডিয়েগো…”

কিন্তু ডিয়েগো তার দিকে তাকাল না।

প্রথমবারের মতো সে আমার দিকে তাকাল।

সেই চোখে আর রাগ ছিল না।

ছিল ভয়।

আর হয়তো এমন কিছু, যা আমি আগে কখনো তার চোখে দেখিনি।

অনুশোচনা।

সত্য জানার জন্য আরও পরীক্ষা করা হলো

পরবর্তী কয়েক দিন আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ দিনগুলোর মধ্যে ছিল।

ডিয়েগো বারবার ফোন করেছিল।

আমি ফোন ধরিনি।

সে মেসেজ পাঠিয়েছিল।

“লরা, প্লিজ আমার সঙ্গে কথা বলো।”

তারপর আরেকটি।

“আমি ভুল করে থাকতে পারি।”

আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

ভুল?

আমার পুরো জীবন ভেঙে দেওয়া কি শুধু একটি ভুল?

সে আমাকে প্রতারক বলেছিল।

আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।

পুরো এলাকায় আমাকে অপমানিত হতে দিয়েছিল।

আমাকে ছেড়ে তার প্রেমিকার কাছে চলে গিয়েছিল।

তারপর ডিভোর্সের কাগজ নিয়ে এসে আমাকে নিজের বাড়ি থেকেও বের করে দিতে চেয়েছিল।

আর এখন সে লিখছে—

“আমি ভুল করে থাকতে পারি।”

আমি ফোনটি বন্ধ করে দিলাম।


কয়েক দিন পর এলো পরীক্ষার ফল

ডা. সালিনাস আমাকে আবার ক্লিনিকে আসতে বললেন।

আমি এবারও একাই গিয়েছিলাম।

কিন্তু ক্লিনিকের বাইরে পৌঁছেই দেখলাম ডিয়েগো সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।

পাউলা তার সঙ্গে ছিল না।

আমার দিকে তাকিয়ে সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

“লরা…”

আমি থামলাম।

“কী চাও?”

সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

“আমি তোমার সঙ্গে ভেতরে যেতে চাই।”

“তুমি যখন আমাকে প্রতারক বলেছিলে, তখন কি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে হয়েছিল?”

সে চোখ নিচু করল।

আমি তাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে গেলাম।

কিছুক্ষণ পর ডাক্তার আমাদের দুজনকেই কক্ষে ডাকলেন।

তার হাতে পরীক্ষার রিপোর্ট ছিল।

আমার হাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল।

ডাক্তার ধীরে ধীরে বললেন,

“ফলাফল পরিষ্কার।”

ডিয়েগো নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।

ডাক্তার রিপোর্টটি টেবিলে রাখলেন।

“শিশুটির জৈবিক বাবা ডিয়েগো।”

আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।

মনে হলো বুকের ওপর থেকে বিশাল একটি পাথর নেমে গেছে।

কিন্তু একই সঙ্গে অন্য একটি অনুভূতি আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিল।

কারণ আমি জানতাম—

আমি নির্দোষ ছিলাম।

আমি প্রথম দিন থেকেই সত্য বলেছিলাম।

আর যে মানুষটি আমাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করার কথা ছিল…

সে-ই আমাকে সবচেয়ে বেশি অপমান করেছিল।


ডিয়েগো ভেঙে পড়ল

“লরা…”

তার কণ্ঠ কাঁপছিল।

আমি তার দিকে তাকালাম।

সে আমার চোখের দিকে তাকাতে পারছিল না।

“আমি… আমি জানি না কী বলব।”

“তাহলে কিছু বলো না।”

সে হঠাৎ আমার সামনে বসে পড়ল।

“আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি।”

আমি হতবাক হয়ে গেলাম।

ডিয়েগো কখনো সহজে ক্ষমা চাইত না।

কিন্তু সেদিন তার চোখে পানি ছিল।

“আমি ভয় পেয়েছিলাম,” সে বলল। “আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে প্রতারণা করেছ।”

“তাই তুমি আমাকে জিজ্ঞেস না করেই রায় দিয়ে দিলে?”

সে মাথা নিচু করল।

“আমি ভুল করেছি।”

আমি ধীরে ধীরে বললাম,

“না, ডিয়েগো। তুমি শুধু ভুল করোনি।”

সে আমার দিকে তাকাল।

“তুমি আমাকে একা ফেলে চলে গিয়েছিলে।”

আমার গলা ভারী হয়ে এল।

“আমি বমি করছিলাম, কাঁদছিলাম, ভয় পাচ্ছিলাম। আমি ভাবছিলাম কীভাবে একা একটি সন্তান বড় করব।”

ডিয়েগোর চোখ থেকে পানি পড়তে শুরু করল।

“আর তুমি?”

আমি বললাম।

“তুমি তোমার প্রেমিকার সঙ্গে রেস্তোরাঁয় ছবি পোস্ট করছিলে।”

সে কিছু বলতে পারল না।

কারণ কোনো ব্যাখ্যা ছিল না।


কিন্তু পাউলার গল্প এখানেই শেষ হয়নি

সেদিন সন্ধ্যায় ডিয়েগো তার বাড়িতে ফিরে গিয়ে পাউলার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল।

কিন্তু সেখানে গিয়ে সে আরও একটি সত্য জানতে পারে।

পাউলা জানত যে ভ্যাসেকটমির পরও একজন পুরুষের সন্তান হতে পারে।

কয়েক সপ্তাহ আগে অফিসে স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি আলোচনার সময় সে বিষয়টি শুনেছিল।

তবুও সে ডিয়েগোকে কখনো কিছু বলেনি।

বরং ডিয়েগো যখন আমাকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল, তখন সে তাকে আরও উসকে দিয়েছিল।

“হয়তো তোমার জানা উচিত, লরা আসলে কেমন,” পাউলা একদিন বলেছিল।

সেদিন ডিয়েগো বুঝতে পারল—

সে শুধু নিজের রাগের কারণে আমাকে হারায়নি।

সে এমন একজন মানুষের কথায় বিশ্বাস করেছিল, যে আমাদের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল।

পাউলা চিৎকার করে বলেছিল,

“তুমি আমাকে দোষ দিতে পারো না! তুমি নিজেই ওকে ছেড়ে এসেছিলে!”

ডিয়েগো শান্তভাবে উত্তর দিয়েছিল,

“হ্যাঁ।”

তারপর সে বলেছিল,

“আর সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।”


কয়েক সপ্তাহ পর…

আমার পেট ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করল।

আমি এখনও ডিয়েগোকে ক্ষমা করিনি।

সে আমার বাড়িতে ফিরে আসেনি।

আমি তাকে ফিরতেও বলিনি।

কিন্তু সে প্রতিটি ডাক্তার দেখানোর দিনে বাইরে অপেক্ষা করত।

প্রথমে আমি তাকে ভেতরে যেতে দিতাম না।

তারপর একদিন…

আমি অপেক্ষা কক্ষে বসে ছিলাম।

সে চুপচাপ পাশে এসে বসেছিল।

আমাদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি।

হঠাৎ আমার পেটের ওপর হাত রেখে আমি বললাম,

“আজ ডাক্তার বলেছে, বাচ্চার নড়াচড়া অনুভব করতে পারি।”

ডিয়েগো আমার দিকে তাকাল।

তার চোখে আবার পানি।

আমি ধীরে ধীরে বললাম,

“হাত রাখো।”

সে কয়েক সেকেন্ড নড়ল না।

যেন সে বিশ্বাস করতে পারছিল না।

তারপর খুব ধীরে হাত বাড়াল।

ঠিক সেই মুহূর্তে বাচ্চাটি নড়ে উঠল।

ডিয়েগোর চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

সে ফিসফিস করে বলল,

“হ্যালো…”

তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।

“আমি তোমার বাবা।”

আমি চোখ বন্ধ করলাম।

সেদিন প্রথমবার মনে হলো…

হয়তো সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি।

কিন্তু সবকিছু আগের মতোও আর কখনো হবে না।


শেষ পর্যন্ত আমি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম

সন্তান জন্মের কয়েক সপ্তাহ আগে ডিয়েগো আবার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল,

“তুমি কি আমাকে কখনো ক্ষমা করতে পারবে?”

আমি অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম।

তারপর বলেছিলাম,

“ক্ষমা করা আর আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া এক জিনিস নয়।”

সে মাথা নাড়ল।

“আমি জানি।”

“তুমি আমাকে বিশ্বাস করোনি, ডিয়েগো।”

আমি তার দিকে তাকালাম।

“আর সম্পর্কের সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—কখনো কখনো একটি ভুল সিদ্ধান্তের চেয়েও বেশি ক্ষতি করে সেই মুহূর্তটি, যখন তুমি এমন একজনকে বিশ্বাস করতে অস্বীকার করো, যে সবসময় তোমার পাশে ছিল।”

ডিয়েগো কিছু বলল না।

কারণ এবার তার কাছে কোনো উত্তর ছিল না।


কয়েক মাস পর, আমাদের সন্তান জন্ম নিল

যখন নার্স ছোট্ট শিশুটিকে আমার বুকে এনে দিলেন, আমি কাঁদছিলাম।

ডিয়েগো আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

সে আমার হাত ধরেছিল।

আমি তার দিকে তাকালাম।

সে বলল,

“ধন্যবাদ।”

আমি হালকা করে মাথা নাড়লাম।

আমাদের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, আমি তখনও জানতাম না।

আমরা আবার একসঙ্গে থাকব কি না, সেটাও জানতাম না।

কিন্তু একটি বিষয় আমি নিশ্চিতভাবে জানতাম—

সত্য প্রকাশ পেতে সময় লাগতে পারে। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে দেওয়া অভিযোগ এবং অবিশ্বাসের ক্ষত অনেক সময় সত্য প্রকাশের পরও থেকে যায়।

আর ডিয়েগো?

সে প্রতিদিন তার সন্তানের দিকে তাকিয়ে এমন একটি সত্যের কথা মনে করত, যা সে খুব দেরিতে বুঝেছিল—

কখনো কখনো সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা অন্য কেউ করে না।

কখনো কখনো আমরা নিজেরাই করি—যখন প্রমাণ ছাড়াই সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে বিশ্বাস করতে অস্বীকার করি।

-

You Might Also Enjoy