Story

লাইফ সাপোর্ট খোলার পর স্বামী যখন বলল শেষ বিদায়, তখন স্ত্রীর মুখ থেকে বের হওয়া সেই ৫টি ভয়ঙ্কর শব্দ ফাঁস করে দিল সমস্ত গোপন সত্য

আইসিইউ-এর সেই হিমশীতল, নির্জন ঘরে কেবল মনিটরের একটানা এবং একঘেয়ে ‘বিপ-বিপ’ শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। বাইরে কাচের জানালায় বৃষ্টির তীব্র ফোঁটা আছড়ে পড়ছিল, যেন ঘরের ভেতরের ভারী নীরবতায় প্রকৃতিও চোখের জল ফেলছিল। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ছিল সারা। তার মুখটি বরফের মতো সাদা ও নিষ্প্রাণ। অসংখ্য নল ও তার তার দুর্বল শরীরের সাথে জোড়া লাগানো ছিল। সাত মাস আগেও সারা ছিল সেই বাড়ির প্রাণ—হাসিখুশি, প্রাণশক্তিতে ভরপুর, জীবনের প্রতিটি রঙকে গভীরভাবে উপভোগ করা এক নারী। কিন্তু শহরের এক নির্জন বাঁকে ঘটা এক রহস্যময় সড়ক দুর্ঘটনা সবকিছু চিরতরে বদলে দিয়েছিল। সেই ভয়াল রাতে তার গাড়িটি গভীর খাদে পড়ে যায়। উদ্ধারকারী দল যখন পৌঁছায়, তখন সারার শ্বাসপ্রশ্বাস প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড়। মাথায় মারাত্মক আঘাতের কারণে সেই রাতেই সে কোমায় চলে যায়।

বিছানার ঠিক পাশেই বসে ছিল ডেভিড। তার মাথা সারার বালিশের কাছে ঝুঁকিয়ে রাখা। ডেভিড—তার নিবেদিতপ্রাণ স্বামী, যে গত সাত মাস হাসপাতালের প্রতিটি রাত নির্ঘুম কাটিয়েছে; অন্তত সমাজের চোখে এটিই ছিল সত্য। ডেভিডের মুখটি মলিন, অযত্নে বেড়ে ওঠা দাড়ি এবং চোখের নিচে স্পষ্ট কালচে দাগ। হাসপাতালের কোনো ডাক্তার বা নার্স যখনই ঘরে ঢুকতেন, ডেভিডের এই নিষ্ঠা ও গভীর ভালোবাসা দেখে তাদের চোখ ভিজে উঠত। কোনো স্বামীকে স্ত্রীর জন্য এতটা ভেঙে পড়তে কেউ কখনো দেখেনি।

কিন্তু সেই সন্ধ্যায় আশার শেষ আলোটুকুও নিভে গেল।

ডা. শর্মা, যিনি প্রথম দিন থেকেই সারার কেসটি দেখছিলেন, ধীরপায়ে ঘরে ঢুকলেন। তার চোখে-মুখে গভীর বিষাদ ও অসহায়তার ছাপ। তিনি ডেভিডের কাঁধে ভারী হাত রাখলেন। ভারাক্রান্ত মনে ডেভিড মাথা তুলল, তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“ডেভিড, আমি অত্যন্ত দুঃখিত,” কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন ডা. শর্মা। “আমরা সাধ্যের সবটুকু চেষ্টা করেছি। নতুন ওষুধ, উন্নত নিউরোলজিক্যাল থেরাপি—সবকিছু। কিন্তু গত রাতের স্ক্যান থেকে এটা পুরোপুরি পরিষ্কার যে সারার মস্তিষ্ক পুরোপুরি সাড়া দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ও কেবল কৃত্রিম যন্ত্রপাতির সাহায্যেই টিকে রয়েছে। লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নিলে হয়তো কয়েক মিনিটের মধ্যেই শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে। এভাবে যন্ত্রণার মাঝে আটকে রাখাটা ওর ওপর অবিচার হবে। আইনি ও চিকিৎসার দিক থেকে সিদ্ধান্তটি এখন তোমার হাতেই।”

ডেভিড দুই হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কাঁধ দুটো থরথর করে কাঁপছিল। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ডাক্তারবাবু, নিজের ভালোবাসাকে চোখের সামনে হারিয়ে যেতে কীভাবে দেব? ওকে তো কথা দিয়েছিলাম শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পাশে থাকব। কিন্তু… কিন্তু ও যদি কষ্টই পায়, যদি কোনো আশাই না থাকে, তবে ওকে আর যন্ত্রণা দিতে চাই না। আপনারা… আপনারা যা ঠিক মনে করেন, সেটাই করুন।”

ডাক্তারবাবু সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করতে বাইরে চলে গেলেন। ঘরের দরজা বন্ধ হতেই ডেভিডের কান্না হঠাৎ থেমে গেল। হাতের তালু দিয়ে সে মুখ মুছল। সেই মুহূর্তে কেউ যদি ডেভিডের চোখের দিকে তাকাত, তবে সেখানে কোনো শোক নয়, বরং এক ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা স্বস্তির ঝলক দেখতে পেত। শিকার সফল হওয়ার পর এক ধূর্ত শিকারির মনে যে তৃপ্তি আসে, ঠিক তেমনই।

ডেভিড সারার হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিল। হাতটি ছিল বরফের মতো শীতল, যেন শ্বেতপাথরের এক প্রাণহীন টুকরো। ডেভিড ঝুঁকে সারার কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল। ঘরে তখন কোনো ডাক্তার বা নার্স ছিল না; কেবল তারা দুজন।

ডেভিডের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল। সে ফিসফিস করে বলল, “বিদায়, আমার প্রিয় সারা। তুমি ভালোই চেষ্টা করেছিলে। দীর্ঘ সাতটি মাস আমাকে এই ভয়ে কাটাতে বাধ্য করেছ যে তুমি হয়তো জেগে উঠবে। কিন্তু আজ… আজ খেলা চিরতরে শেষ। তুমি কী ভেবেছিলে? আমার সেই গোপন অ্যাকাউন্টের কথা পুলিশকে বলে দেবে আর আমি তামাশা দেখব? সেদিন গাড়ির ব্রেক নষ্ট হওয়াটাকে কি নিছক দুর্ঘটনা ভেবেছিলে? না সারা, ওটা দুর্ঘটনা ছিল না। ওটা ছিল আমার মাস্টারস্ট্রোক। আর আজ, তোমার এই অগাধ সম্পত্তি, এই বিলাসবহুল বাড়ি, সমস্ত টাকা আর ব্যবসা—সব আমার হবে। আর সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার হলো, এই পৃথিবী আমাকে চিরকাল এক নিঃস্ব, প্রেমময় স্বামী হিসেবেই মনে রাখবে।”

কথা শেষ করে ডেভিড সারার কপালে চুমু খেল। সেই চুম্বনে কোনো ভালোবাসা ছিল না, ছিল এক ঠান্ডা প্রতারণার চূড়ান্ত সিলমোহর।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন নার্স ও ডা. শর্মা ঘরে ঢুকলেন। পরিস্থিতি এতটাই ভারী ছিল যে বাতাসের প্রবাহও যেন থমকে গিয়েছিল। নার্সরা ধীরে ধীরে মনিটরের শব্দ বন্ধ করলেন। অক্সিজেনের প্রধান ভালভটি নামিয়ে দেওয়া হলো। একে একে লাইফ সাপোর্টের সংযোগগুলো সারার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হতে লাগল। গলার ভেতর থেকে যখন ভেন্টিলেটরের মূল নলটি খুলে নেওয়া হলো, তখন ঘরের চেনা যান্ত্রিক শব্দ চিরতরে থেমে গেল। সেখানে তখন কেবল ডেভিডের ঘনিয়ে আসা শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

ডাক্তার ঘড়ির দিকে তাকালেন। “এখন কেবল কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা, ডেভিড। তুমি চাইলে ওর সাথে শেষ সময়টুকু একান্তে কাটাতে পারো।” ডাক্তার ও নার্সরা শ্রদ্ধাভরে ঘরের বাইরে গিয়ে দরজার ওপাশে দাঁড়ালেন, যাতে স্বামী তার স্ত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে পারে।

ডেভিড শেষবারের মতো সারার মুখের দিকে তাকাল। মনে মনে সে বিজয়ের উল্লাসে মেতে উঠেছিল। সে ভাবছিল তার নতুন ভবিষ্যৎ, নতুন প্রেমিকা অ্যালিনা এবং সারার কোটি টাকার বীমার অর্থের কথা। আর মাত্র দুটো মিনিট, তারপরই বাইরে গিয়ে বুক চাপড়ে কান্নার অভিনয় শুরু করবে।

সে পেছন ফিরে দরজার দিকে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই ঘটে গেল এমন এক অভাবনীয় ঘটনা, যা ডেভিডের মেরুদণ্ড বেয়ে ভয়ের হিমশীতল স্রোত বইয়ে দিল।

গত সাত মাস ধরে নিথর ও অসাড় পড়ে থাকা সারার আঙুলগুলো হঠাৎ নড়ে উঠল। মুহূর্তে তা ডেভিডের কব্জি চেপে ধরল। সেই স্পর্শ কোনো মুমূর্ষু মানুষের দুর্বল হাত ছিল না; তাতে ছিল এক অবিশ্বাস্য ও অনমনীয় জোর।

ভয়ে ডেভিডের শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল। ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও সে পারল না; সারার আঙুলের বাঁধন ছিল লোহার শৃঙ্খলের মতো অটুট। ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল তার, সারা শরীর ঘামে ভিজে উঠল।

“এ… এটা কীভাবে সম্ভব?” শব্দহীন এক আর্তনাদ বের হলো ডেভিডের মুখ দিয়ে।

ঠিক তখনই সারার চোখের পাতা ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল। মাসের পর মাস বন্ধ থাকা চোখ দুটি একসময় পুরো খুলে গেল। সেই চোখ কোনো কোমায় থাকা রোগীর মতো ঝাপসা বা বিভ্রান্ত ছিল না। তাতে জ্বলছিল এক ভয়াল ক্রোধের আগুন, এক নিখাদ ঘৃণা ও স্পষ্টতা—যা দেখে ডেভিডের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। সারা সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে সরাসরি ডেভিডের চোখের দিকে তাকাল। তার শুকনো, ফেটে যাওয়া ঠোঁট দুটো নড়ল। গলা থেকে এক চাপা, গভীর শব্দ বেরিয়ে এলো, তবে সেই আওয়াজ ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে স্পষ্ট গমগম করে উঠল।

সারা ধীরে ধীরে, প্রতিটি শব্দের ওপর জোর দিয়ে মাত্র ৫টি শব্দ উচ্চারণ করল:

“আমি তোমার সব সত্যি শুনেছি।”

সেই পাঁচটি শব্দ ডেভিডের কানে কোনো বিস্ফোরণের মতো ফাটল।

“আমি… তোমার… সব… সত্যি… শুনেছি।”

ডেভিডের মাথা স্তব্ধ হয়ে গেল, চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। এক লহমায় তার সাজানো পৃথিবী তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ল। সে বুঝতে পারল, সারা কেবল শারীরিকভাবে কোমায় ছিল, কিন্তু তার মস্তিষ্ক সবকিছু শুনছিল! প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত, ডেভিডের প্রতিটি ফিসফিসানি, তার সব ষড়যন্ত্র আর পরিকল্পনা সে নীরবে শুনে গেছে। কয়েক মিনিট আগে নিজের অহংকারে অন্ধ হয়ে ডেভিড তার কানের কাছে যা যা স্বীকার করেছিল, তার প্রতিটি অক্ষর সে শুনে ফেলেছে।

আতঙ্ক, মানসিক ধাক্কা আর এই অলৌকিক ঘটনার ভয় ডেভিডের মস্তিষ্ক সহ্য করতে পারল না। তার রক্তচাপ হঠাৎ নেমে গেল, চোখের সামনে নেমে এলো ঘন অন্ধকার, আর সে মেঝের ওপর প্রাণহীন বস্তার মতো আছড়ে পড়ে সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।

মেঝেতে ডেভিডের ভারী পতনের শব্দ শুনে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ডা. শর্মা ও নার্সরা আতঙ্কিত হয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ছুটে এলেন। তারা ভাবলেন, হয়তো স্ত্রীর বিয়োগব্যথায় স্বামী অচেতন হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিছানার কাছে পৌঁছাতেই যে দৃশ্যটি তারা দেখলেন, তা বিজ্ঞানের সমস্ত নিয়ম ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ধারণাকে ওলটপালট করে দিল।

বিছানায় শুয়ে থাকা সারা, যার লাইফ সাপোর্ট কিছুক্ষণ আগেই খুলে ফেলা হয়েছিল, সে নিজে থেকেই গভীর শ্বাস নিচ্ছে! তার চোখ দুটো খোলা এবং ফ্যাকাশে গালে ধীরে ধীরে জীবনের রক্তিম আভা ফিরে আসছে। কাঁপাকাঁপা হাত তুলে সে ডাক্তারের দিকে ইশারা করল এবং জড়ানো গলায় ফিসফিস করে বলল, “পু… পুলিশ… পুলিশকে ডাকুন।”

ডা. শর্মা বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এটি অলৌকিক ঘটনার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। চিকিৎসার ভাষায় একে ‘লকড-ইন সিন্ড্রোম’ বা হঠাৎ চেতনার প্রত্যাবর্তন বলা যেতে পারে, যেখানে রোগী বাইরের জগতের সবকিছু শুনতে ও বুঝতে পারলেও শরীরের অসাড়তার কারণে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে না। সারার শরীর নিথর থাকলেও তার মন সজাগ ছিল। আর ডেভিডের সেই চরম স্বীকারোক্তিই সারার অবচেতন মনে বেঁচে থাকার এমন এক জেদ জাগিয়ে তুলেছিল, যা তার স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিটি কোষে বিদ্যুতের মতো শক্তি জুগিয়েছিল।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তৎক্ষণাৎ জরুরি অবস্থা জারি করল। ডেভিডকে তুলে অন্য ঘরে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হলো, আর ডা. শর্মার দল দ্রুত সারার তত্ত্বাবধান শুরু করলেন। তাকে আইসিইউ-এর একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত ও বিশেষ কেবিনে স্থানান্তরিত করা হলো।

প্রায় দু’ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরলে ডেভিডের মাথা অসম্ভব ভারী লাগছিল। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার মনে হলো সে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু সারার সেই ৫টি শব্দ এবং চোখের সেই জ্বলন্ত দৃষ্টি মনে পড়তেই সে পাগলের মতো বিছানা ছেড়ে উঠে বসল। কপাল বেয়ে ঝরঝর করে ঠান্ডা ঘাম ঝরছিল।

“আমাকে এখান থেকে পালাতে হবে! এখনই শহর ছেড়ে যেতে হবে!” বিড়বিড় করতে করতে সে দরজার দিকে ছুটে গেল।

কিন্তু দরজা খুলতেই তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল উর্দিধারী দুই পুলিশ অফিসার। আর তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন শহরের অন্যতম তুখোড় গোয়েন্দা, ইন্সপেক্টর বিক্রম।

“কোথায় যাওয়ার এত তাড়া, মিস্টার ডেভিড?” গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন ইন্সপেক্টর বিক্রম। তার চোখে ছিল এক তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ।

ডেভিডের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। “ইন্সপেক্টর… আপনি এখানে? আমার স্ত্রী… সারা মারা গেছে, আমাকে ওর শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করতে হবে।”

ইন্সপেক্টর বিক্রম এক শুকনো হাসি দিয়ে বললেন, “মিসেস সারা কোথাও যাচ্ছেন না, মিস্টার ডেভিড। বরং উনি খুব দ্রুত সেরে উঠছেন। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, জ্ঞান ফিরেই উনি ওনার প্রথম জবানবন্দি নথিভুক্ত করিয়েছেন।”

ডেভিডের মুখের শেষ রক্তবিন্দুও যেন উবে গেল। “জবানবন্দি? কিন্তু উনি তো কোমায় ছিলেন! ওর মানসিক ভারসাম্য ঠিক নেই, ডাক্তার নিজেই তো বলেছিলেন ব্রেন ড্যামেজ হয়ে গেছে! কোমায় থাকা কোনো রোগীর কথায় আপনারা কীভাবে বিশ্বাস করতে পারেন?” ডেভিড ভয়ার্ত গলায় চিৎকার করে উঠল।

“আমরা শুধু ওনার কথার ওপর নির্ভর করছি না,” ইন্সপেক্টর বিক্রম পকেট থেকে একটি ছোট স্বচ্ছ খাম বের করলেন, যার ভেতরে ছিল একটি ছোট রেকর্ডার এবং কিছু নথি। “সারা আমাদের জানিয়েছেন, গত সাত মাস ধরে যখনই আপনি একা এই ঘরে আসতেন, তখন আপনার বান্ধবী অ্যালিনার সাথে ফোনে কী কথা বলতেন। সুইজারল্যান্ডের যে গোপন অ্যাকাউন্টে আপনি টাকা পাঠাতেন, সেটির নম্বরও উনি দিয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় কথা, যে মেকানিককে দিয়ে আপনি সারার গাড়ির ব্রেক নষ্ট করিয়েছিলেন, তার সাথে আপনার কথোপকথনের হুবহু বিবরণ দিয়েছেন।”

ডেভিডের মুখের কথা আটকে গেল। “এ… এসব মিথ্যে! এ এক বিরাট ষড়যন্ত্র!”

“ষড়যন্ত্র তো আপনি করেছিলেন, মিস্টার ডেভিড,” হাতকড়া বের করতে করতে বললেন ইন্সপেক্টর বিক্রম। “কিন্তু আপনি ভুলে গিয়েছিলেন, মানুষ যখন সব আশা হারিয়ে ফেলে, তখন সত্যই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সারার শরীর বন্দী থাকলেও তার বিবেক ও মস্তিষ্ক ছিল মুক্ত। আপনার প্রতিটি ষড়যন্ত্র, প্রতিটি তারিখ আর পরিকল্পনা সে মস্তিষ্কে নথিবদ্ধ করে রেখেছিল।”

হাসপাতালের করিডোর দিয়ে যখন হাতকড়া পরিয়ে ডেভিডকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন সে কান্নায় ভেঙে পড়ে চিৎকার করছিল। অন্যান্য রোগী, নার্স ও ডাক্তাররা—যারা গতকাল পর্যন্ত তাকে এক মহান ও নিবেদিতপ্রাণ স্বামী মনে করতেন—আজ তার দিকে চরম ঘৃণা আর ধিক্কারের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। বহু যত্ন করে গড়ে তোলা ডেভিডের সেই মিথ্যা মুখোশটি চিরদিনের জন্য খসে পড়েছিল।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে সারার স্বাস্থ্যে অভাবনীয় উন্নতি দেখা গেল। ফিজিওথেরাপির সাহায্যে সে ধীরে ধীরে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখল। আদালতে মামলা শুরু হলে সারার জবানবন্দি ও তার দেওয়া সূত্রের ভিত্তিতে পুলিশ ডেভিড ও অ্যালিনার বিরুদ্ধে এমন অকাট্য প্রমাণ হাজির করল যে আদালতের কাছে কোনো সন্দেহের অবকাশ রইল না। হত্যাচেষ্টা, প্রতারণা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অপরাধে ডেভিডকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।

কয়েক বছর পর, পুরোপুরি সুস্থ হয়ে সারা নতুনভাবে নিজের জীবন শুরু করল। সেই হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগকে সে একটি বড় অনুদান প্রদান করে। জীবনের সাতটি মাস যেখানে সে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পার করেছিল, সেই ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সারা বাইরের মুক্ত বাতাসের উষ্ণতা অনুভব করল।

সে বুঝেছিল, জীবন কখনো কখনো আমাদের এমন এক অসহায় অন্ধকার কোণে ঠেলে দেয়, যেখানে নিজের কণ্ঠস্বরটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়। কিন্তু সত্য যদি পাশে থাকে, তবে একাকী নীরবতাও একদিন সবচেয়ে বড় গর্জন হয়ে ওঠে। এক প্রতারক স্বামী যেদিন তার স্ত্রীকে চিরতরে নিশ্চুপ করিয়ে দিতে চেয়েছিল, সেদিনই প্রকৃতি সেই নারীর ৫টি সাধারণ শব্দের মধ্যে এমন এক শক্তি ঢেলে দিয়েছিল, যা একজন অপরাধীকে জীবন্ত কবর দেখিয়ে দিয়েছিল।

-

You Might Also Enjoy