রাতে দেখা দেওয়া ২টি অস্বস্তিকর লক্ষণকে উপেক্ষা করেছিলেন ২০-এর কোঠার এক যুবক, ক্যান্সারে মৃত্যু
ক্যান্সারের কিছু লক্ষণ রাতে আরও স্পষ্ট হতে পারে, কিন্তু সবাই এ বিষয়টি জানেন না।
বর্তমানে আবহাওয়া দিন দিন গরম হয়ে উঠছে, তাই অনেকের ঘাম হওয়া এবং সামান্য অসুস্থতার কারণে হালকা জ্বর দেখা দিচ্ছে। তবে তাইওয়ানের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক উ ঝাওসিন সতর্ক করে বলেছেন, অস্বাভাবিক ঘাম বা জ্বর, বিশেষ করে রাতে দেখা দিলে তা ক্যান্সারসহ কোনো গুরুতর রোগের লক্ষণ হতে পারে।
সম্প্রতি প্রচারিত অনলাইন স্বাস্থ্যবিষয়ক অনুষ্ঠান “Doctor Is So Hot”-এ তিনি জানান, তিনি এমন অনেক রোগী দেখেছেন যারা এসব লক্ষণকে গুরুত্ব না দেওয়ায় খুব দেরিতে ক্যান্সার শনাক্ত করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত মারা গেছেন।
বিশেষ করে ২০ ও ৩০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এমন ঘটনা দেখা যায়। কারণ তারা কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকেন এবং নিজের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে অনেক সময় অসতর্ক থাকেন।

২০-এর কোঠায় লিম্ফোমায় মৃত্যু যুবকের
চিকিৎসক উ ঝাওসিনের সবচেয়ে আক্ষেপের একটি ঘটনা ছিল ২০-এর কোঠার এক যুবকের, যিনি পরে লিম্ফোমা বা লিম্ফ নোডের ক্যান্সারে মারা যান।
চেন পদবির ওই যুবক তাইপেইতে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতেন। পরিবারের সদস্যদের বর্ণনা ও চিকিৎসা নথি অনুযায়ী, তিনি ছিলেন লম্বা ও শক্তসমর্থ এবং ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা করতেন। তাই তিনি খুব কমই অসুস্থ হতেন।
নিজের স্বাস্থ্য নিয়েও তিনি বেশ অসতর্ক ছিলেন।
একদিন হঠাৎ তার দীর্ঘস্থায়ী জ্বর এবং রাতে প্রচুর ঘাম হওয়া শুরু হয়। এই অবস্থা টানা এক সপ্তাহ চললেও তিনি এমনকি ওষুধও খাননি।
প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে উপসর্গ চলার পর তিনি ওষুধ খেতে শুরু করেন। কিছুদিন উপসর্গ কমলেও পরে আবার দেখা দেয়।
তিনি মনে করেছিলেন, তার শরীরের তাপমাত্রা এমনিতেই বেশি, তিনি অনেক শারীরিক পরিশ্রম করেন এবং তখন গরমের মৌসুমও চলছিল—তাই বিষয়টি নিয়ে আর চিন্তা করেননি।
এভাবেই তিনি রাতের ওই দুটি অস্বস্তিকর লক্ষণ—জ্বর ও অতিরিক্ত ঘাম—নিয়ে তিন মাসেরও বেশি সময় কাটান।
চতুর্থ মাসে প্রবেশ করার পর তার ডান কান ফুলে যায় এবং কানের পেছনে একটি বড় ও ব্যথাযুক্ত গাঁট দেখা দেয়। তখনই তিনি হাসপাতালে যেতে রাজি হন।

স্থানীয় হাসপাতালের চিকিৎসকরা তার লিম্ফোমা হতে পারে বলে সন্দেহ করেন এবং বায়োপসি করার পরামর্শ দেন।
কিন্তু তিনি এতটাই অবাক হয়েছিলেন যে নিজেকে ক্যান্সার রোগী বলে বিশ্বাসই করতে পারেননি। তাই তিনি শুধু কানের সমস্যার চিকিৎসা করাতেই জোর দেন।
এক বছরেরও বেশি সময় পর তিনি তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং অচেতন অবস্থায় চিকিৎসক উ ঝাওসিনের হাসপাতালে জরুরি বিভাগে ভর্তি হন।
এবার পরীক্ষার ফলাফলে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে যে তিনি নন-হজকিন লিম্ফোমায় আক্রান্ত।
প্রায় পাঁচ বছর পর দীর্ঘ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি ২০-এর কোঠাতেই এই রোগে মারা যান।
চিকিৎসক উ ঝাওসিন বলেন, এই ঘটনাটি তাকে খুব কষ্ট দেয়, কারণ যুবকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত এবং চিকিৎসার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়টি হারিয়েছিলেন।
এই ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি লিম্ফোমার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ সম্পর্কে সতর্ক করেন।
লিম্ফোমার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলো
– লিম্ফ নোড বা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া
ঘাড়, বগল বা কুঁচকির মতো স্থানের লিম্ফ নোড অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যেতে পারে।
প্রাথমিক পর্যায়ে বেশিরভাগ রোগীর ব্যথা নাও থাকতে পারে। রোগ অগ্রসর হলে ব্যথা দেখা দিতে পারে।
লিম্ফ নোডগুলো ধীরে ধীরে বড় হয় এবং সাধারণত মাঝারি শক্ত ও একই ধরনের গঠনযুক্ত হয়। এগুলো সাধারণত ত্বকের সঙ্গে লেগে থাকে না এবং ত্বকের নিচে নড়াচড়া করতে পারে।
রোগের শেষ পর্যায়ে লিম্ফ নোডগুলো আরও বড় হয়ে একত্রিত হয়ে বড় গাঁট তৈরি করতে পারে।
– ত্বকের উপসর্গ
লিম্ফোমা রোগীদের ত্বকে লালচে ফুসকুড়ি, ফোসকা, পুঁজযুক্ত ক্ষতসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
রোগের শেষ পর্যায়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ত্বকে সংক্রমণ, ঘা এবং ক্ষত থেকে তরল বের হওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
– সারা শরীরে দেখা দেওয়া উপসর্গ
এর মধ্যে রয়েছে:
- জ্বর
- ক্লান্তি
- ক্ষুধামন্দা
- রাতে অতিরিক্ত ঘাম
- কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই হঠাৎ এবং উল্লেখযোগ্য ওজন কমে যাওয়া
সাধারণত ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে শরীরের ওজন ৫–১০ শতাংশ কমে গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
– রক্তস্বল্পতা, চলাফেরার ক্ষমতা কমে যাওয়া ও শ্বাসকষ্ট
টিউমার বড় হওয়ার কারণে রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে।
এছাড়া বড় লিম্ফ নোড শ্বাসনালিতে চাপ সৃষ্টি করলে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। রক্তনালিতে চাপ পড়লে হাত-পা ফুলে যাওয়া এবং চলাফেরায় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
– স্নায়বিক উপসর্গ
যদি লিম্ফোমা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে মাথাব্যথা, অচেতন হয়ে যাওয়া বা খিঁচুনির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
এছাড়াও, লিম্ফোমা অগ্রসর পর্যায়ে পৌঁছালে মেরুদণ্ডে চাপ পড়ার কারণে প্রস্রাব ও পায়খানার সমস্যা, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, রক্তবমি, লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হওয়া, হৃদস্পন্দনের অনিয়ম বা হৃদযন্ত্রের ব্যর্থতার মতো গুরুতর সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
